ঐতিহ্যের বাঁশ-বেতের ঝুড়িতে অনন্য ‘ধুছনির দই’

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৩১ এএম

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্নি ইউনিয়ন। একদিকে বিস্তীর্ণ হাকালুকি হাওর, অন্যদিকে গ্রামীণ জনপদের সহজ-সরল জীবন। ভোরের আলো ফুটতেই হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে শুরু হয় নতুন দিনের ব্যস্ততা। কেউ বের হন গরু-মহিষের দুধ সংগ্রহে, কেউ ঘরের কাজে, আবার কেউ প্রস্তুতি নেন এমন এক খাবার তৈরির, যার স্বাদ ও পরিবেশনের ধরন বড়লেখার সীমানা পেরিয়ে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে দেশের নানা প্রান্তে। নাম তার বর্নির ‘ধুছনির দই’।

সাধারণ দইয়ের সঙ্গে এর পার্থক্য শুধু স্বাদে নয়, এর গল্পেও। এই দই তৈরি হয় গরু ও মহিষের দুধে, আর জমিয়ে রাখা হয় বাঁশ-বেতের তৈরি বিশেষ এক গোলাকার পাত্রে, স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘ধুছনি’। সেই ধুছনিতে দই পাতা হয় বলেই এর নাম হয়েছে ‘ধুছনির দই’। বড়লেখার বর্নি ইউনিয়নের হাকালুকি হাওরপাড়ের নিহারী-ফড়িঙ্গা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে এই ঐতিহ্য বহুদিন ধরে টিকে আছে। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি খাবার নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র স্বাদ, একটি পারিবারিক পেশা এবং একটি জনপদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।

এই দইয়ের গল্প শুরু হয় দুধ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। হাকালুকির পাড়ের গ্রামগুলোতে গরু ও মহিষ পালন করেন অনেক পরিবার। ভোরে দুধ সংগ্রহ করে তা নিয়ে আসা হয় দই তৈরির কারিগরদের কাছে। দুধ চুলায় বসিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে দুধ ঘন হতে থাকে, রং বদলে নেয়। এরপর সেই ঘন গরম দুধ ঢেলে দেওয়া হয় আগে থেকে প্রস্তত করা ধুছনিতে।

ধুছনি তৈরির কাজটিও কম ঐতিহ্যবাহী নয়। বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি ছোট গোলাকার ঝুড়ির মতো এই পাত্রের ছিদ্রগুলো বিশেষভাবে বন্ধ করে তবেই সেখানে দুধ ঢালা হয়। কোথাও ময়দার প্রলেপ ব্যবহার করে পাত্রের ছিদ্র বন্ধ করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে দুধ জমে তৈরি হয় দই। মাটির হাঁড়ি বা আধুনিক প্লাস্টিকের পাত্রের বদলে বাঁশ-বেতের তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী পাত্রই ধুছনির দইকে দিয়েছে তার আলাদা পরিচয়।

একটি দইয়ের পাত্র কীভাবে একটি জনপদের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে, বর্নির ধুছনির দই তার অনন্য উদাহরণ। এই দইয়ের স্বাদে যেমন রয়েছে হাকালুকি হাওরপাড়ের গরু-মহিষের দুধের স্বাতন্ত্র্য, তেমনি এর পরিবেশনে রয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছাপ। মহিষের দুধ তুলনামূলক ঘন হওয়ায় দইয়ের ঘনত্ব ও স্বাদে আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় বলে স্থানীয় কারিগর ও ভোক্তারা মনে করেন। অনেকের কাছে এই দইয়ের বিশেষত্ব হলো এর স্বাভাবিক স্বাদ—চাহিদা অনুযায়ী চিনি বা অন্য কোনো উপাদান যোগ না করেও এটি পরিবেশন করা হয়।

বর্নির ধুছনির দইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের পারিবারিক শ্রম। স্থানীয় কারিগর গৌরাঙ্গ দাসের পরিবারের মতো কিছু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই দই তৈরির কাজ করে আসছে। মাটির হাঁড়ির পাশাপাশি বাঁশ-বেতের ধুছনিতে দই পাতার এই রীতি দুই থেকে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। একসময় যা ছিল পরিবারের নিজস্ব পেশা ও স্থানীয় পরিসরের একটি খাবার, সময়ের সঙ্গে সেটিই মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে এসেছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের পর ধুছনির দইয়ের পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে, বেড়েছে ক্রেতার আগ্রহ।

এই গল্পে শুধু দই তৈরির কারিগররাই নেই; আছেন ধুছনি তৈরির কারিগররাও। বাঁশ-বেতের কাজ জানা স্থানীয় নারীরা তৈরি করেন সেই বিশেষ পাত্র। তাঁদের হাতে বাঁশ ও বেতের সরল উপকরণ রূপ নেয় এমন এক পাত্রে, যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিচয়। ধুছনি তৈরির এই কারিগরি দক্ষতাও এক ধরনের লোকজ জ্ঞান, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে আছে। ফলে একটি ধুছনির দইয়ের পেছনে শুধু দুধওয়ালা বা দই কারিগর নন, বরং বাঁশ-বেতের কারিগর থেকে শুরু করে হাওর পাড়ের গরু-মহিষ পালনকারী পরিবার অনেক মানুষের শ্রম যুক্ত থাকে।

বর্নির ধুছনির দই এখন আর শুধু বর্নি ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বড়লেখার পাশাপাশি মৌলভীবাজারের জুড়ী, সিলেট ও গোলাপগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় এর চাহিদার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দূরের ক্রেতারাও অনেক সময় এই দই সংগ্রহ করতে আসেন। বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নেও এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে এটি স্থানীয় খাবার থেকে আঞ্চলিক পরিচিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

একটি ঐতিহ্যবাহী খাবারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাদ, কিন্তু তার দীর্ঘস্থায়ী পরিচয় তৈরি হয় গল্পের মাধ্যমে। ধুছনির দইয়ের গল্পে রয়েছে হাকালুকি হাওরের জল, হাওরপাড়ের মানুষের জীবন, গরু-মহিষ পালনের গ্রামীণ অর্থনীতি, বাঁশ-বেতের কারু শিল্প এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা পারিবারিক ঐতিহ্য। এ কারণেই এই দইকে শুধু খাবার হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত মূল্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি বড়লেখার লোকজ সংস্কৃতির একটি জীবন্ত নিদর্শন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় খাবার এখন পর্যটন ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কোনো একটি অঞ্চলের বিশেষ খাবার সেই অঞ্চলের পরিচয়কে বহুদূর নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন বহু ঐতিহ্যবাহী খাবার রয়েছে, যেগুলো যথাযথ ব্র্যান্ডিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত হতে পারে। বর্নির ধুছনির দইও সেই সম্ভাবনার একটি উদাহরণ হতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে হলে শুধু জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানসম্মত প্যাকেজিং, সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড পরিচয়। একই সঙ্গে ধুছনি তৈরির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ এই দইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো এর স্বাতন্ত্র্যে দুধের স্বাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধুছনিও এই খাবারের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বড়লেখা উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও ঐতিহ্যবাহী ধুছনির দইকে উপজেলার বিশেষ অর্জন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির উদ্যোগের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

হাকালুকির পাড়ে হয়তো আজও ভোর শুরু হয় খুব সাধারণভাবে। দুধ সংগ্রহে বের হন মানুষ, চুলায় বসে দুধ জ্বাল দেওয়া হয়, বাঁশ-বেতের ধুছনি প্রস্তুত করেন কারিগররা। কিন্তু সেই সাধারণতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক গল্প। কয়েক ঘণ্টার শ্রমে যখন ঘন দুধ ধীরে ধীরে দইয়ে পরিণত হয়, তখন তৈরি হয় শুধু একটি খাবার নয় তৈরি হয় একটি ঐতিহ্যের নতুন অধ্যায়।

বর্নির ধুছনির দই তাই বড়লেখার স্বাদের এক অনন্য স্বাক্ষর। এর পেছনে রয়েছে হাকালুকির প্রকৃতি, মানুষের শ্রম, গ্রামীণ জীবনের সরলতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে আনা এক ঐতিহ্য। মাটির হাঁড়ি পেরিয়ে বাঁশ-বেতের ধুছনিতে, স্থানীয় গ্রাম থেকে আঞ্চলিক বাজারে এই দইয়ের যাত্রা এখন আরও দূরের পথের অপেক্ষায়।

‘ধুছনির দই’র কারিগর গৌরাঙ্গ দাস ঝাড়ন ও তার স্ত্রী সুমিত্রা রাণী দাস জানান, সংগ্রহ করা এ দুধ হাড়িতে বসিয়ে খড়-কাঠির চুলোয় অনবরত নাড়তে হয়। এভাবে টানা প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় এ দুধ জ্বাল দেয়া হয়। তারপর এ দুধ গাড় বাদামি রঙ হয়ে গেলে- দই তৈরির উপযুক্ত হয়ে ওঠে। আগে থেকে তৈরি করে রাখা বাঁশ বেতের বিভিন্ন আকৃতির ধুছনির ভিতরের ছিদ্র ময়দার প্রলেপ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে ঘন দুধ ধুছনিতে ঢেলে সাজানোর পর জমাট বেঁধে দইয়ের রূপান্তরিত হয়। এটিই হচ্ছে- বর্ণির ‘ধুছনি দই।

হয়তো একদিন বড়লেখার নাম উচ্চারিত হলে আগর-আতরের পাশাপাশি উঠে আসবে আরেকটি পরিচয়—বর্নির ধুছনির দই। আর হাকালুকি হাওরের পাড় থেকে উঠে আসা সেই অনন্য স্বাদ তখন পৌঁছে যাবে দেশের সীমানা পেরিয়ে আরও দূরের কোনো অচেনা টেবিলে।

সেই যাত্রার শুরু কিন্তু এখানেই হাকালুকির পাড়ে, বর্নির মাটিতে, এক টুকরো বাঁশ-বেতের ধুছনিতে জমে থাকা দুধের সাদা স্তরে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত