কর্ণফুলী নদীর ওপর ব্রিটিশ আমলে (১৯৩১ সালে) নির্মিত কালুরঘাট সেতুটি জরাজীর্ণ ও বেহালদশা। প্রায় শতবর্ষী ৬৩৮ দশমিক ৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ সেতুর ওপর দিয়ে ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে রেল ও যানবাহন। এ বেহালদশা থেকে মুক্তি দিতে ২০১৮ সালে রেল কর্র্তৃপক্ষ ৭ দশমিক ২ মিটার উচ্চতার আরেকটি নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তখনই প্রস্তাবিত সেতুটির উচ্চতা নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিওটিএ) আপত্তি তুললে জটিলতা দেখা দেয়। যার সুরাহা হয়নি এখনো। যদিও রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, জটিলতা কেটে গেছে। শিগগিরই কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
রেলওয়ে ও বিআইডব্লিউটিএ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ের প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী নতুন কালুরঘাট সেতুর উচ্চতা রাখা হয়েছে ৭ দশমিক ২ মিটার। রেলওয়ের মতে, বর্তমান বিদ্যমান রেললাইন অ্যালাইনমেন্ট অনুসারে নির্মিতব্য সেতুর উচ্চতা সর্বোচ্চ ৯ মিটার পর্যন্ত করা যাবে। কিন্তু দেশের সব নৌপথের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ শুরু থেকেই রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছে যে কর্ণফুলীর যেই অংশে নতুন সেতু নির্মিত হবে, সেখানে নেভিগেশন চ্যানেল ঠিক রাখতে এবং ঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য কর্ণফুলী নদীতে অবস্থান করা নৌবাহিনীর জাহাজসহ বাণিজ্যিক লাইটারেজ জাহাজগুলোর কালুরঘাট সেতু পার হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। দুঃসময়ে জাহাজ পারাপারে নতুন নির্মিতব্য সেতুটি যাতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করে সেজন্য সেতুর উচ্চতা বাড়ানোর প্রস্তাব রেখেছে বিআইডব্লিউটিএ। শেষ পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএ’র প্রস্তাবনা অনুসারেই কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন কালুরঘাট সেতুটি নির্মিত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শুরুতেই ঝুঁকিপূর্ণ কালুরঘাট সেতুর পরিবর্তে নতুন একটি রেলওয়ে কাম সড়ক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে। এরই অংশ হিসেবে রেলওয়ে ২০১৩ সালে একটি রেলওয়ে কাম সড়ক সেতু নির্মাণে ডিপিপি তৈরি করে। প্রকল্পটির নাম ছিল ‘কর্ণফুলীতে কন্সট্রাকশন অব রেলওয়ে কাম রোড ব্রিজ প্রকল্প’। কিন্তু অর্থায়ন জটিলতায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটি থমকে ছিল। শেষ পর্যন্ত সেতুটি নির্মাণে ১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা অর্থায়নে সম্মত হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)। ২০১৮ সালের শুরুতেই এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক চুক্তি হয়েছে দুই সংস্থার মধ্যে। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগেই নানা জটিলতায় থমকে যায়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান বিদ্যমান ৪ দশমিক ২ মিটার উচ্চতার কালুরঘাট সেতুটি অনেক পুরনো। তাই পুরনো এই রেল সেতুর ৮০ মিটার উত্তরে ৭ দশমিক ২ মিটার উচ্চতার নতুন আরেকটি সেতু নির্মাণের জন্য রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেয়। এমনকি এ সেতুটি নির্মাণে দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফের সঙ্গে রেলওয়ের ঋণ চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু উচ্চতা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ আপত্তি তোলে। তখন এ সেতু নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তবে এখন তার সমাধান হয়েছে। এতে উচ্চতা ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। আশা করি আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন রেল কাম সড়ক সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা দরকার। রেল ও নানা যানবাহনে এ সেতুর ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লোকজন চলাচল করছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চতা নিয়ে যেই জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় কালুরঘাট সেতুটি নির্মিত হবে। বিষয়টি নিয়ে রেল মন্ত্রণালয় কাজ করছে। আশা করি শিগগিরই কর্ণফুলী নদীর ওপর সড়ক কাম রেল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে।’
