রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায় ভ্যানগাড়িতে সবজি বিক্রি করেন শফিকুল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তার ভ্যানগাড়িতে থরে থরে সাজানো নতুন সবজি চোখে পড়ল। টাটকা এসব সবজির দামও আগের চেয়ে কিছুটা কম, মানেও ভালো। আগের চেয়ে দাম কিছুটা কম হওয়ায় ক্রেতারাও একটু বেশি কিনছেন।
শফিকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, শীতের মাল (সবজি) আরও কিছুদিন আগে থেকেই আসতে শুরু করেছে। তবে এ সপ্তাহে একটু বেশি। এ জন্য দামও একটু কমছে। এই ধরেন গত সপ্তাহে শিমের কেজি ৮০ টাকা বেচলেও এ সপ্তাহে ৭০ টাকায় বেচছি। এখন থেকে নিয়মিতই দাম কমবে। তয় পুরোপুরি দাম কমতে অগ্রহায়ণ মাস লাগবে।
চলতি বছর দেশে তিন দফায় দীর্ঘমেয়াদি ও এক দফায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা হয়। এতে লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। যার প্রভাবে ছয়-সাত মাস ধরে চড়ছে সবজির দাম। কয়েক দিন আগেও ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি মিলছিল না। গত কয়েক দিনে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। বাজারে আসতে শুরু করেছে শীতের সবজি। নতুন নতুন সবজি আসার প্রভাবে দামেও কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। নিয়মিত এই দাম কমবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে চট্টগ্রামে এখনো চড়া সব ধরনের সবজির দাম। কাঁচা মরিচের দাম এখনো চড়া। আর সরকারনির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না আলু।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিক্রেতারা বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, নতুন আলুসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজি সাজিয়ে রেখেছেন। গত সপ্তাহে বাজারে কেজিপ্রতি শিম ৮০-১২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও গতকাল তা ৭০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি বাঁধাকপি-ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকা। প্রতি কেজি বরবটি আগে ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল তা ৭০-৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি গাজর ১০ টাকা কমে ৭০-৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। বেগুন ৫০-৭০, শসা ৫০, মুলা ৫০, কাঁকরোল ৬০, করলা ৮০, চিচিঙ্গা ৬০-৭০, ঝিঙে ৬০, পেঁপে ৩০-৪০, ধুন্দল ৮০ ও ঢেঁড়স ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
তবে বাজারে এখনো অনেক চড়া শীতকালীন সবজির দাম। প্রতি আঁটি লালশাক, ডাঁটাশাক বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। পালংশাকের আঁটি ১৫ ও মিষ্টিকুমড়ার শাকের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা দরে। প্রতি আঁটি লাউশাক বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা দরে। বাজারে প্রতিটি লাউ ৬০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া আকারভেদে ৪০-৫০ টাকা ও চালকুমড়া ৪০-৬০ দরে বিক্রি হয়েছে।
আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির পর গত ২২ নভেম্বর থেকে খুচরায় দাম সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। তবে এই দামে আলু বিক্রি করছেন না কেউ। বাজারে প্রতি কেজি আলু খুচরায় ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। বাড়তি দামের জন্য আড়তদারদের দুষছেন খুচর দোকানিরা। আর আড়তদাররা বলছেন, হিমাগার থেকে বাড়তি দামে বিক্রি করায় তারাও বেশি দামে বিক্রি করছেন।
বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৯০ ও আমদানি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। দেশি রসুন ১২০ ও চায়না ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি চিকন মসুরডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩০ ও মোটা ১০০ টাকা। মুগডালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা দরে।
বাজারে প্রতি কেজি ছোট আকারের রুই-কাতলের কেজি ২০০-২২০ টাকা ও বড় আকারের রুই-কাতল ৩৫০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি তেলাপিয়া ১৪০-১৬০, পাঙাশ ১৪০, পাবদা ও টেংরা ৪০০-৫০০, হাইব্রিড কই ১৮০-২২০, শিং ৫০০, ছোট চিংড়ি ৫০০, গলদা ও বাগদা ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
চট্টগ্রামে চড়ছে সবজির দাম : বাজারে শীতকালীন সবজি আসতে শুরু করেছে। তবে দামে কোনো প্রভাব পড়েনি। উল্টো কিছু কিছু সবজির দাম আরও বেড়েছে। বাজারভেদে দামের পার্থক্যও অনেক। নগরীর বাজারে কেজিপ্রতি পটোল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ ও আলু ৪৫-৫০ টাকা। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বরবটি ৮০, উচ্ছে ৮০-১০০, ঢেঁড়স ৬০, শসা ৬০, ঝিঙ্গা ৫৫-৬০, ২০ টাকা বেড়ে টমেটো ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। মানভেদে কেজিপ্রতি গাজর বিক্রি হচ্ছে ৮০, কাঁচা মরিচ ২০০ ও শিম ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া বাঁধাকপির কেজি ৬০ টাকা ও ফুলকপি আকার ও মানভেদে ১০০-১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
রেয়াজউদ্দিন বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. শরীফ জানান, আড়তে যা সবজি আসে তা কাড়াকাড়ি করে নিতে হয়। লাগছে ৪০ কেজি, পাচ্ছি ২০ কেজি। দামও চড়া। এমন না যে প্রচুর সবজি। স্থানীয় উপজেলা থেকে সবজি আসছে না। তাই দাম চড়া। সবজির দাম একেবারে কমে কেজিতে ২০-৩০ টাকা হয়ে যাবে এমন পরিস্থিতি নেই। কমলেও কিছুটা কমবে তা-ও মাসের শেষে।
চট্টগ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান : এদিকে গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয় কাজির দেউড়ি কাঁচাবাজারে। সেখানে নির্বাহী হাকিম ১ কেজি মরিচের দাম এক দোকানে ১৫০ অন্য দোকানে ২০০ টাকা, টমেটোর দাম ১০০ টাকা অন্য দোকানে ১৪০ টাকা বিক্রির প্রমাণ পান।
জেলা নির্বাহী হাকিম উমর ফারুক বলেন, ‘সবজি বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছেন। মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করে এবং সবজির ক্রয় রসিদ না রেখে ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিক্রেতাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একজন আরেকজনকে দোষারোপ করেন। এসব অনিয়মের কারণে ওই বাজারের ১৫ জন সবজি বিক্রেতাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।’ এ ছাড়া মাপেও কারচুপি পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
