হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রবিবার। হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম (বড়) মাদ্রাসার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন সংগঠনের নেতারা। নতুন আমির কে হচ্ছেন এ নিয়ে হাটহাজারীসহ সারা দেশে হেফাজতের ভক্ত-অনুরাগীসহ নানা মহলের রয়েছে আগ্রহ।
তবে সম্মেলনের আগে আহমদ শফীপন্থী নেতাদের সংবাদ সম্মেলন ও একটি প্রচারপত্র নিয়ে সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গুঞ্জন, দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
হাটহাজারিতে বিলি হওয়া একটি প্রচারপত্রে একসঙ্গে দেখা যায় জুনায়েদ বাবুনগরী ও মানবতাবিরোধী মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত, সাবেক জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদীকে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর পৌরসভার নুর মসজিদের সামনে মোটরসাইকেলে এসব প্রচারপত্র সড়কে ফেলে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান দুই ব্যক্তি। তবে প্রচারপত্রে নাম ছিল না। বিলিকৃত প্রচারপত্র কীসের ইঙ্গিত বহন করে এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রচারপত্রে লেখা ‘হাটহাজারী মাদ্রাসায় মানবতাবিরোধী সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাঈদীপুত্র শামীম সাঈদের আনাগোনা এ কিসের ইঙ্গিত?’
তবে বাবুনগরীপন্থী নেতারা জানান, গত বছরের রমজানের সময় কোনো এক অনুষ্ঠানে এ ছবি তোলা। এখন সম্মেলনকে ঘিরে এ ছবি দিয়ে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।
এদিকে শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহী অভিযোগ করে বলেন, ‘এ কাউন্সিলের মাধ্যমে হুজুরের গড়া সংগঠনকে সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে’।
হেফাজতের আমির আল্লামা শফির পুত্র মাওলানা আনাস মাদানি হেফাজতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকলেও কাউন্সিল নিয়ে তার তেমন ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। আল্লামা শফির মৃত্যুর পর থেকে তিনি অনেকটা নীরব রয়েছেন। বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

আহমদ শফির শ্যালক মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী বলেন, হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফি হেফাজতে ইসলামকে মুসলমানদের ঈমান আকিদা রক্ষার জন্য দলমত নির্বিশেষে সব মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই হেফাজতকে ক্ষমতালোভী একটি গোষ্ঠীর পকেট কমিটিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। কমিটিতে শফি, মুফতি আমিনী ও চরমোনাই পির অনুসারীদের বাদ দেওয়ার নীলনকশা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত যারা হেফাজত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফির সঙ্গে চরম বেয়াদবি ও অমানবিক আচরণ করতে বেশি উৎসাহিত ছিলেন, এবার হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনে তাদেরই বেশি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
২০১০ সালে চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামের সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংগঠনটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ১৩ দফা দাবি জানিয়ে। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর অবরোধের মাধ্যমে তারা সবার মনযোগ কাড়ে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আমির হিসেবে দায়িত্ব পান হাটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফি। আমৃত্যু তিনি এ দায়িত্ব পালন করে যান। চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আহমদ শফির মৃত্যু পর হেফাজত আমিরের পদটি শূন্য হয়। রবিবার সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এ পদে দেখা যাবে নতুন মুখ।
হেফাজতের শীর্ষ এ পদে কে আসছেন তা নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা হেফাজতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে থাকলেও, সংগঠনটির বেশির ভাগ অংশ চান ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানান্তরিত করতে। এ জন্য ঢাকায় অবস্থানরত হেফাজতের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের থেকে আমির ও মহাসচিব নির্বাচনের ব্যাপারেও অনেকে ভাবছেন, এমন দাবি করেছেন হেফাজতের বেশ কয়েকজন নেতা।
.jpg)
এ সম্মেলনে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত শাহ আহমদ শফির অনুসারীদের কৌশলে বাদ রেখে নতুন কমিটি গঠনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা অভিযোগ করেন।
এদিকে সম্মেলনে সারা দেশ থেকে কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেমরা যোগদানের জন্য পথে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। হেফাজতের প্রায় সাড়ে তিন শ কেন্দ্রীয় শীর্ষ আলেম সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে নতুন আমির নির্বাচিত করবেন।
নতুন আমির হিসেবে বর্তমান মহাসচিব ও হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক জুনায়েদ বাবুনগরীকে বেশির ভাগ আলেম সমর্থন করলেও চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার মাদ্রাসার পরিচালক ও হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা নায়েবে আমির মুফতি ইজহারুল ইসলামের নামও রয়েছে আলোচনায়।
হেফাজতের মহাসচিব পদ নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। এ পদটির জন্য একাধিক নাম শোনা গেলেও হেফাজতের শীর্ষ নেতা মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমী বা মাওলানা মামুনুল হককে এ পদে দেখতে চাইছেন বেশির ভাগ আলেম।
হেফাজতে কাউন্সিল বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম নেতা মাওলানা মীর ইদরিস কাউন্সিল অধিবেশনে বর্তমান কমিটির অনেকে দাওয়াত পায়নি, এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বর্তমান কমিটির সব নেতাকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি।

বিলি হওয়া প্রচারপত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছুসংখ্যক দুর্বৃত্ত এ প্রচারপত্র বিলি করতে পারে। তাদের যদি সাহস থাকত তাহলে তারা প্রচারপত্রে নিজেদের নাম ব্যবহার করত।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সারা দেশের আলেম সমাজ। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে যিনি আমির নির্বাচিত হবেন তাকে নিয়েই হেফাজতের কমিটি গঠিত হবে’।