মানবিক আদেশে বাড়ছে বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ০১:৪৯ এএম

বাড়ির মালিকানা নিয়ে জটিলতার জেরে রাজধানীর গুলশানে বাবার বাড়িতে প্রবেশ করতে পারছিলেন না দুই বোন মুশফিকা মোস্তফা ও মোবাশশারা মোস্তফা। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেওয়া আদেশে প্রয়াত মোস্তফা জগলুল ওয়াহিদের দুই মেয়ের বাড়িতে প্রবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়। রাতেই দুই বোনকে ওই বাড়িতে তুলে দেয় গুলশান থানা পুলিশ। গত ৮ অক্টোবর রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদন নজরে এলে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার চার অবোধ শিশুর জামিন আবেদন নিষ্পত্তি করে রাতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বাড়ি পৌঁছানোর নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। আদেশের পর রাতেই তাদের বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে যশোর জেলা প্রশাসন। সাবেক এক অ্যাটর্নি জেনারেলের দুই নাতিকে ধানমণ্ডির পৈতৃক বাড়িতে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, গত ৩ অক্টোবর রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে এমন আলোচনা ওঠে। এটি নজরে আসার পর রাত ১২টার দিকে আদালত বসিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ দিয়ে দুই শিশুকে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।

গত এক মাসে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনায় মানবিক, নজিরবিহীন ও ইতিবাচক আদেশ ও রায় এসেছে হাইকোর্ট থেকে। কোনো কোনো ঘটনায় আদেশ দিতে মধ্যরাতেও বসেছে আদালত। আইনজীবীরা বলছেন, উচ্চ আদালতের এমন উদ্যোগ ও আদেশ প্রশংসনীয়। এতে বিচারপ্রত্যাশীদের প্রত্যাশা বাড়ছে। দীর্ঘসূত্রতা ও বিচার পেতে ভোগান্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। সম্প্রতি এ ধরনের কয়েকটি মানবিক আদেশ ও রায়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় বিচার বিভাগ ও আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। মামলাজট ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি নিরসনেও কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারা অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা পদাধিকারবলে সমগ্র বাংলাদেশের জাস্টিসেস অব দ্য পিস এবং দায়রা জজ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকারবলে নিজ নিজ এলাকার জন্য জাস্টিসেস অব দ্য পিস হিসেবে বিবেচিত হন।

প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো সঠিক বিচার করা। সম্প্রতি যেসব বিষয়ে উচ্চ আদালতে ব্যতিক্রমী এবং দৃষ্টান্তমূলক আদেশ হয়েছে সেগুলোকে নিঃসন্দেহে সবাই সঠিক ও ন্যায়বিচার বলবেন। জাস্টিসেস অব দ্য পিস হিসেবে বিচারকদের স্বাধীনতা রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী মানুষের বিচার সুনিশ্চিত হলে এটিকে সবাই সমর্থন করবেন।’ ‘দ্য প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ অনুযায়ী লঘু দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর বিপরীতে প্রবেশন সম্পর্কিত এই রায়টিকে নজিরবিহীন এবং ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন আইনজীবীরা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চায়। আর যখন ন্যায়বিচার পায় তখন স্বাভাবিকভাবেই আদালতের প্রতি তাদের এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়। উচ্চ আদালত ন্যায়বিচারের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা মামলার ভারে এতটাই ভারাক্রান্ত যে চাইলেও অনেক কিছু করতে পারেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসামিকে শুধু কারাগারে রাখলেই হবে না। তাকে সংশোধন ও অনুশোচনারও সুযোগ দিতে হবে। আশা করব উচ্চ আদালত এ ধরনের বিষয়ে আরও বেশি ভূমিকা রাখবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘এই লাখ লাখ মামলা নিষ্পত্তি রাতারাতি সম্ভব নয়, কেবল বিচারকের পক্ষেও এগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে না। এজন্য বিচারসংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। সেখানে আইনসংশ্লিষ্টসহ উচ্চ আদালতের বিচারপতিগণও থাকবেন এবং তারা এ বিষয়ে মতামত ও আদেশ দেবেন।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধানে নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার কথা বলা আছে। যখন নাগরিক সেটি পায় তখন আদালতের কাছে প্রত্যাশা বাড়ে। জনস্বার্থের মামলায় ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আদালত ভালো ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সেই জনস্বার্থের বিষয়টি হতে হবে যথার্থ। না হলে এর অপব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারকরা যথেষ্ট ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো মামলাজট কেন হয়? এই জট কিন্তু আদালতের মাধ্যমে হয় না। মামলা হওয়ার কারণ কমাতে হবে। কেননা মামলা হওয়ার কারণ উদ্ভবের কারণে মামলা বাড়ে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত