মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ ব্যাধি। সাম্প্রতিককালে দেশের নানাবিধ সামাজিক সংকটের মধ্যে খুবই গুরুতর এক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মাদকাসক্তি। বিশেষত দেশের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশই নানা ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। একইসঙ্গে নানা সামাজিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজি-চুরি-ছিনতাইসহ যৌন-নিপীড়ন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে সম্পৃক্তদের একটা বড় অংশই মাদকাসক্ত। ফলে সমাজে মাদকাসক্তির প্রভাব যে পারিবারিক পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায় পর্যন্ত বহুদূর বিস্তৃত সে কথা বলা বাহুল্য। সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করার রাজনৈতিক ঘোষণা কিংবা বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের কথা শোনা যায়। আবার সংবাদ মাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশব্যাপী মাদকের কারবারের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজশ এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের যোগসাজশের কথাও সামনে উঠে আসে। এসব ঘটনায় মাদক নির্মূলের অঙ্গীকার ও আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় বৈকি।
একদিকে সমাজে মাদকাসক্তির ভয়াবহ থাবা, আরেকদিকে মাদক নির্র্মূলে প্রশাসনিক দোদুল্যমানতা। এই দুই সংকট নিয়ে কমবেশি কথা হলেও এসবের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে মাদকাসক্তের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারের বিষয়টি। সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর অনুমোদন নিয়ে রাজধানী ঢাকায় ১০৫টিসহ সারা দেশে ৩১২টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় শর্ত মেনে চলছে না। অনুমোদিত এসব কেন্দ্রের পাশাপাশি কোনোরকম লাইসেন্স না নিয়েই মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের নামে রাজধানীসহ দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে সাইনবোর্ড-সর্বস্ব অনুমোদনহীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মাদকাসক্তদের সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার নজির কম; বরং এসব কথিত নিরাময় কেন্দ্র মাদক কেনাবেচা ও সেবনের নিরাপদ ঘাঁটি বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট লোকজনকে ম্যানেজ করে চলছে এগুলোর কার্যক্রম। শনিবার দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় সারা দেশে অনুমোদনহীন এমন ১ হাজার ২০০ মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এসব মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে রোগীদের ওপর ভয়ংকর নির্যাতন-নিপীড়নে বহু রোগীর মৃত্যুও ঘটে। পুলিশ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে সারা দেশের মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলো থেকে ১৭ রোগীর লাশ উদ্ধার হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে দেশে মাদকসক্তির চিকিৎসাসেবার করুণ চিত্রটা টের পাওয়া যায়।
দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা কত তা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়েই নির্ভরযোগ্য কোনো গবেষণা বা তথ্য নেই। তবে, সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় দুই বছর আগে সিআইডির ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কমান্ড্যান্ট শাহ আলম এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০১০ সালে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখে। এর মধ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সের মাদকসেবী আছে ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ হিসাবে দেশের তরুণদের প্রতি ১৭ জনে একজন মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের ১০ জনের একজনও যদি চিকিৎসা নিতে চান তাহলে দেশে মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৬ লাখ ৬০ হাজার। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় সরকার অনুমোদিত সব মাদক নিরাময় কেন্দ্র মিলিয়েও এর শতকরা ১ ভাগ রোগীকেও চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। এদিকে দেশে নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন মোট মাদকাসক্তের ১০ থেকে ১৫ শতাংশই নারী। কিন্তু সরকারিভাবে নারী মাদকাসক্তদের জন্য আবাসিক চিকিৎসার কোনো সুযোগই নেই। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে পুরুষই হোক কিংবা নারী ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে বিনা খরচে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা করানোর দায়িত্ব সরকারের।
দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে এবং মাদকাসক্তির ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণে সরকার কতটা দায়িত্ব পালন করছে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় মাদকাসক্তির চিকিৎসাসেবার আরও একটি ঘোরতর সংকটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়ে থাকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্সে স্পষ্ট বলা আছে, এ ধরনের কেন্দ্র শুধু মাদক সম্পর্কিত চিকিৎসা দিতে পারবে, মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে পারবে না। মনোচিকিৎসা দিতে হলে তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ‘হাসপাতাল/ক্লিনিক’-এর লাইসেন্স নিতে হবে। অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ২০০৫ সালের বিধিমালার গ-ধারায় বলা হয়েছে প্রতি ১০ জন রোগীর জন্য কমপক্ষে একজন মনোরোগ চিকিৎসক (খন্ডকালীন বা সার্বক্ষণিক), দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয় থাকতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এমন অবস্থান সাংঘর্ষিক কি না সেটার সুরাহা জরুরি। কেননা, বিধিবিধান পরিবর্তন করে হলেও মাদকাসক্তির মতো ভয়াবহ ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো জরুরি।