জামিনের পর অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে তিনি কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হন।
গত মার্চে নিখোঁজ হন কাজল। এর দুই মাস পর যশোর সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
কাজলের নিখোঁজের পর থেকে অনলাইন ও অফলাইন তার জন্য সরব ছিলেন অনেকেই। তাদের একজন ছোটপর্দার নামি নির্মাতা আশফাক নিপুণ। যিনি কাজলের জন্য প্রতিদিন লিখেছেন।
শুক্রবার কাজলের মুক্তির পর দীর্ঘ পোস্ট দেন তিনি। সঙ্গে যোগ করেন ছেলের সঙ্গে কারা ফটকের বাইরে কাজলের আলিঙ্গনের ছবি। সেখানে লেখেন—
“এই একটা দৃশ্য দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তীব্র জিদ আমাকে গত ৯ মাস চাঙা করে রাখত প্রতিটা মুহূর্তে। অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার হওয়া বাবা মুক্তি পেয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, এর চাইতে শক্তিশালী দৃশ্য কি কোন সিনেমায়ও দেখেছি আমি?
৯ মাস আগে সাংবাদিক কাজল যখন অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে গুম হন তখন দিনলিপির হিসাব রাখতাম আমি। দিনের উল্লেখ করে প্রতিদিন একবার করে লিখতাম ‘আজকেও সাংবাদিক কাজল বাসায় ফেরেননি’। সবাই বলত ‘কোন আশা নাই, উনি আর ফিরবেন না’। বলত ‘এসব নিয়ে লেখালেখি কইরেন না, শুধু শুধু ঝামেলায় পড়বেন’! কিন্তু কিসের একটা জিদ থেকে আমি লিখেই যেতাম! কাজলকে চিনতাম না, তার পরিবারের কারো সাথেও পরিচয় নাই আমার। এই প্রতিবাদ থেকেই তার নিখোঁজ হওয়ার ১ মাস পর পরিচয় হয় কাজলের অসম সাহসী ছেলে মাত্র ২১ বছর বয়সী মনোরম পলকের সাথে। দেখলাম পুরো একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে ছোট ছেলেটা নানানভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাবাকে মুক্ত করতে। করোনার কারণে তখন বাইরে বের হওয়া বন্ধ। এর মধ্যেও ছেলেটা অনলাইনে দেশি, বিদেশি নানান সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্টদের নিয়ে ওয়েবিনার করে বাবার মুক্তির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে (প্রথম ওয়েবিনারে আমারও থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল)। শুরু হয় #whereiskajol ক্যাম্পেইন। প্রথম সেই ওয়েবিনার করার ১২ দিনের মাথায় কাজলকে পাওয়া যায়। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপরের পথ পরিক্রমা আরও দীর্ঘ। ৪টা মামলায় এই করোনা ঝুঁকিতেও কাজল তখন জেলে, জামিন আর পান না। শুরু হয় #freekajol ক্যাম্পেইন। আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এবং তার টিম একনিষ্ঠভাবে লেগে পড়ে কাজলের মুক্তির মামলায়। নিয়মিত অনলাইনের পাশাপাশি শহীদ মিনারেও কাজলের মুক্তি চেয়ে প্রতিবাদের আয়োজন হয়। সবাই থেমে যায়, ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজ নিজ কাজে। কিন্তু পলক আর তার পরিবারের তো হতাশ হয়ে পড়ার সময় নেই। ওরা হাল ধরে বসে থাকে। আমিও। পলক মাঝে মাঝেই বলত ‘ভাইয়া হতাশ লাগে। যেদিন জামিন শুনানি হবে সেদিন ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করে না। জানিই তো জামিন দিবে না। বাবাকে কী বলব বুঝতেও পারি না।’ আমিও বুঝতে পারি না কী বলে সান্ত্বনা, সাহস দিবো ওকে। কারণ জামিন নাকচ হয় ১৫ বার! কিন্তু পরক্ষণেই আবার নতুন উদ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যায় সে। তারই ফলশ্রুতি আজকের এই দৃশ্য। বাবা কাজল ফিরে যাচ্ছে ছেলে পলকের কাছে, মেয়ে পৌষির কাছে।
এই ছবিটা যত দেখি ততই গা কেঁপে চোখে পানি চলে আসে আমার। ছেলে আজকে বাবা হয়েই বাবাকে মুক্ত করে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে। আর বাবা স্বস্তিতে, খুশিতে শিশুর মতো কাঁদছে! এর চাইতে ভালোভাবে কি শেষ হতে পারত এই বছর?”
