‘ছুটি না পেয়ে’ কারখানার গাড়িচালকের মৃত্যু: লাশ নিয়ে অবস্থান স্ত্রীর

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:২৬ পিএম

শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় কর্তৃপক্ষের অবহেলায় স্বামীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলে ক্ষতিপুরণ ও বিচারের দাবিতে লাশ নিয়ে তার কর্মস্থলে অবস্থান করছেন রহিমা নামে দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূ। রবিবার সকাল থেকেই তিনি আশুলিয়ার পলাশবাড়ি এলাকায় অবস্থিত স্বামীর কর্মস্থল স্কাইলাইন কারখানার সামনে অবস্থান করছেন।

এর আগে ভোর ৪টার দিকে নিজ ভাড়া বাসার টয়লেটে স্ট্রোক করে মারা যান রহিমার স্বামী মো. নজরুল ইসলাম (৫৫)। তিনি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানা এলাকার বাসিন্দা এবং ১২ বছর ধরে স্কাইলাইন নামক তৈরি পোশাক কারখানার গাড়ি চালাতেন বলে দাবি করেন তার স্ত্রী রহিমা।

রহিমা জানান, গত কয়েক মাস ধরে তার স্বামীর বুকে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব হচ্ছিল। এ জন্য চিকিৎসকের কাছে গেলে তার বুকে পানি জমেছে জানিয়ে প্রথমে ১৫ দিন বিশ্রামে থাকতে বলা হয়। ঘটনাটি জানিয়ে নজরুল ইসলাম কারখানায় ছুটি চাইলে তাকে ছুটি না দিয়ে কাজ করতে বলা হয়। পরবর্তীতে গত ২৯ ডিসেম্বর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে পুনরায় ছুটির আবেদন করেন। কিন্তু এ্যাডমিন ম্যানেজার আনিস তাকে ছুটি না দিয়ে উল্টো অপমান করে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন। এদিকে শনিবার রাতেও কারখানায় কাজ করে বাসায় ফেরার পর রবিবার ভোর ৪টার দিকে বাসার টয়লেটে স্ট্রোক করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নিহত নজরুলের স্ত্রী রহিমার অভিযোগ, যথাসময়ে কারখানা থেকে আমার স্বামীকে ছুটি দেওয়া হলে ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পারতাম। এ ছাড়া চিকিৎসক বিশ্রাম নিতে বলেছিল সেটা করা হলেও হয়তো আমার স্বামী বেঁচে থাকতে পারতেন। কারখানা কর্তৃপক্ষের উদাসিনতায় যেহেতু বিনা চিকিৎসায় আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে, তাই এ মৃত্যুর দায় কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবে এড়াতে পারে না। এজন্য আমি বিচার এবং ক্ষতিপূরনের দাবিতে স্বামীর লাশ নিয়ে কারখানার সামনে অবস্থন করছি। এভাবে যেন বিনাচিকিৎসায় আর কোনো শ্রমিক মারা না যায় এবং কোনো নারী যেন বিধবা না হয়, কোন সন্তান যেন এতিম না হয়। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্কাইলাইন কারখানার প্রশাসন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার আরাফাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হঠাৎ অসুস্থ হয়েই তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রহিমা কারখানার সামনে আসার পর আমরা তার স্বামী নজরুলের সব পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছি।

বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শ্রমিক লীগ কেন্দ্রিয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সারোয়ার হোসেন বলেন, আমি সকাল থেকেই স্কাইলাইন কারখানার সামনে ছিলাম এবং রহিমার সঙ্গে কথা বলে তার কাছে থাকা সমস্ত কাগজপত্র দেখে বুঝতে পারি কারখানা কর্র্তৃপক্ষের উদাসিনতায় ও অমানবিক আচরণের কারণে নজরুলের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া অসুস্থ হয়ে ছুটি চাওয়ার পরও ছুটি না দিয়ে তারা শ্রম আইনের লঙ্ঘন করেছে। উপরন্তু তাকে চাকুরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করেছে। নজরুলের অসুস্থ্যতার বিষয়টি কারখানার মালিকও জানতো। এ জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মানবিক বিবেচনায় হলেও ক্ষতিপূরণ দিতে অনুরোধ করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদের কথায়ও কর্ণপাত না করেনি। বিষয়টি আলোচনা সাপেক্ষে সব শ্রমিক সংগঠনকে একত্রিত করে পরবর্তী কর্মসূচীসহ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনার সময় শিল্প পুলিশের উপ-পরিদর্শক নুর উদ্দিন তাদের এসপি স্যারের নাম বলে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনিও মৃত লোকটার সঙ্গে প্রতারণা করে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আঁতাত করে চলে যান। বিষয়টি আমরা শিল্প পুলিশের এসপিকে জানিয়েছি, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ করেছি’।

এ বিষয়ে জানতে শিল্প পুলিশের এসপি সানা শামীনুর রহমানের ফোনে একাধিকবার কল করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত