এক কড়াইয়ে প্রতিদিন রান্না হয় তিন হাজার মানুষের খাবার

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২:৫৫ পিএম

কড়াইয়ের ব্যাস সাড়ে ৮ ফুট ও গভীরতা দুই ফুট। প্রতিদিন এই কড়াইয়ে রান্না হয় প্রায় তিন হাজার অসহায় মানুষের খাবার।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের তৈরি বিশাল এই কড়াইয়ের ওজন প্রায় এক টন। এতে খাবার রান্না করার জন্য চারটি চুলা একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। প্রায় ১ হাজার কেজির বেশি খাবার এক সঙ্গে রান্না করা যাবে। এত বড় কড়াইয়ে রান্নার সময় নাড়া দেয়ার জন্য চারপাশে উচু পাকা টুলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কড়াইটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা।

দেশের অসহায় পথশিশু, সুবিধা বঞ্চিত দরিদ্র ও অসচ্ছল শিশু ও অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন সব সময় কাজ করে থাকে। এবার তারা কেরানীগঞ্জের গদাবাগে তৈরি করল এই মেগা কিচেন।

কেরানীগঞ্জের জিনজিরা থেকেই তৈরি করা হয়েছে কড়াইটি। এত বড় কড়াই কেউ তৈরি করতে রাজি হয়নি। যিনি তৈরি করেছেন তিনিও কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কড়াই তৈরিতে না করে দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে অনেক অনুরোধ করার পর প্রায় তিন মাস সময় নিয়ে তৈরি হয় কড়াইটি। বিদ্যানন্দ দাবি করছে, এটিই রান্না করার জন্য দেশে তৈরি সবচেয়ে বড় কড়াই।

মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জের গদারবাগ এলাকায় মেগা কিচেনে গেলে কথা হয় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের হেড অব কমিউনিকেশন মো. সালমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই আমরা বড় পরিসরে পথ শিশু ও অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করতে থাকি। এত লোকের খাবারের আয়োজন বিদ্যানন্দ অনেক আগে থেকেই করে আসছে। তবে আমরা ভাবছিলাম কীভাবে অল্প সময়ে ও অল্প শ্রমে বেশি লোকের খাবারের ব্যবস্থা করা যায়।

‘মূলত শ্রম ও সময় বাঁচাতেই আমাদের এই মেগা কিচেনের পরিকল্পনাটা মাথায় আসে। পরে আমরা এইখানে মেগা কিচেনটি স্থাপন করি।’

এই জায়গাটা প্রায় তিন হাজার স্কয়ার ফুট। জায়গাটা অনুদান দিয়েছেন স্থানীয় প্রিন্টিং ব্যবসায়ী এমদাদুল হক। তিনি নিজেও বিদ্যানন্দের একজন স্বেচ্ছাসেবক ও দাতা।

তিনি আরও বলেন, তিন হাজার লোকের রান্না করতে অনেকগুলো চুলা লাগত, পাতিল লাগত, সময় লাগত, গ্যাস অপচয় হতো অনেক। আর এক সঙ্গে এত খাবার রান্না করতে অনেক লোকেরও প্রয়োজন হতো। এখন মাত্র ৩-৪ ঘণ্টায় মাত্র তিনজন মিলে অনায়াসে ২-৩ হাজার লোকের খাবার রান্না করা যায়, গ্যাসের অপচয়ও কম হয়। বিশাল আকৃতির এই কড়াই তৈরি করার উদ্দেশ্যই ছিল রান্নার কাজটাকে সহজ করা।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ১ টাকার আহারের খাবার রান্না হয় এই মেগা কিচেনে।

গত ১৩ জানুয়ারি চালু হওয়া এই মেগা কিচেনে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন হাজার লোকের খাবার রান্না করা হয়। পরে তা বিলিয়ে দেয়া হয় রাজধানীর মিরপুর, ভাষানটেক, দুয়ারীপারা, রায়ের বাগসহ আশপাশের বস্তিগুলোতে।

এছাড়াও হাইকোর্ট মাজার, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন সহ নানান জায়গায় অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝেও বিলিয়ে দেয়া হয় এই খাবার।

বিশাল এই কড়াইতে প্রতিদিন ২/৩ হাজার লোকের রান্না করতে গড়ে প্রায় আশি হাজার টাকা খরচ হয়। সম্পূর্ণ টাকাটাই আসে অনুদানের থেকে। প্রতিদিন এ কড়াইতে রান্না করা শাহী খিচুড়িতে থাকে চাল, ডাল, ডিম, নানান পদের সবজি, এছাড়াও থাকে গরু, খাসি অথবা মুরগির মাংস। অনেক বড় আকারের আয়োজন হলেও স্বাদের সঙ্গে কখনোই আপস করে না বিদ্যানন্দ।

সালমান আরও জানান, বিদ্যানন্দের ১ টাকায় পেট ভরে আহার প্রকল্পটা শুরু হয়েছিল প্রতিদিন ৩০ জন পথশিশুকে খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে, বর্তমানে এ প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন ২/৩ হাজার অসহায় মানুষ খাবার পাচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য প্রতিদিন ১ লাখ লোককে খাওয়ানো। তাদের কার্যপরিধি বাড়ানো জন্য অতি দ্রুতই তারা মোটরসাইকেলের মাধ্যমে অসহায়দের মাঝে খাবার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবে।

এছাড়া শুধু ঢাকা নয় ঢাকার বাইরেও অসহায়রা যেন খাবার পায় সেই লক্ষে রান্না করা খাবারের পরিবর্তে অসহায়দের মাঝে খাদ্য উপকরণ বিতরণের চিন্তা-ভাবনাও আছে বিদ্যানন্দের।

২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর কিশোর কুমার দাসের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

বিদ্যানন্দের মোট ১২টি শাখা চালু হয়। কিশোর কুমার দাস পেরুতে থাকেন। বর্তমানে তিনি দেশেই আছেন। তিনি নিজেই স্বেচ্ছাসেবকদের রান্নার কৌশল শেখাচ্ছেন কয়েক দিন ধরে। মেগা কিচেনের এই পরিকল্পনা সফল হলে দেশব্যাপী বিদ্যানন্দের মেগা কিচেন তৈরি হবে বলেন আশা করছেন ফাউন্ডেশনটি।

মেগা কিচেনে বিশাল আকৃতির কড়াইটির পাশেই বড় করে লেখা ‘সেরা সম্পর্কগুলো খাবার শেয়ার থেকে সৃষ্টি হয়।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত