ভারতের হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসের ঘটনায় এশিয়ার বড় নদীগুলোর বিপন্নতার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই এমন অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেছিল। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতোই এশিয়ার সরকারগুলো জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট বিরূপ অবস্থাকে এড়িয়ে গেছে। এড়িয়ে যাওয়ার ফল হিসেবে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় নদীর উৎসস্থল এশিয়া। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেকংয়ের মতো নদী এ মহাদেশের হাজার হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এ নদীগুলোর কারণে বহু কৃষক-মৎসজীবী টিকে আছে। পেশাভিত্তিক জায়গা ছাড়াও কোটি কোটি মানুষ বেঁচে আছে এ নদীগুলোর স্বাদু পানির ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে নদীগুলো ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হিমবাহগুলো ক্রমেই গলতে শুরু করেছে। ফলে নদীগুলো কানায় কানায় ভরে যাচ্ছে। এতে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে এবং পানির নিরাপদ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সমালোচকরা এ ঘটনার জন্য অনিয়ন্ত্রিত বাঁধ নির্মাণ এবং দূষণকে দায়ী করেছেন। দূষণের ফলে নদীকেন্দ্রিক বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপলস নামক সংগঠনের হিমাংশু ঠ্যাক্কার এএফপিকে বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কারণে নদীগুলো ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে আছে। উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট আবর্জনা, তরল পদার্থ, বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে নদীগুলোর ক্ষতি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আর এর প্রভাব ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আমাদের নদীগুলো এখন সবচেয়ে হুমকির মুখে।’
ভারতে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের একাধিক ব্রিজ, রাস্তা এবং দুটি হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ অবস্থায় আছেন। কী কারণে হিমবাহের ধস হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, হাইড্রো পাওয়ার প্রকল্প দুটির কারণেই এ অবস্থা হয়েছে। কারণ ওই অঞ্চল এমনিতেই ভূমিকম্পপ্রবণ। এ ব্যাপারে হিমাংশু আরও বলেন, ‘এ অঞ্চল এমনিতেই ঝুঁকিপ্রবণ। ফলে এখানে এমন হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট করা ঠিক হয়নি। হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট করার আগে যে জরিপগুলো করতে হয়, এ ক্ষেত্রে সেগুলো করা হয়নি।’
কানাডাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা প্রোব ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী ব্যবস্থাপক প্যাট্রিসিয়া অ্যাডামসের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্ল্যান্ট পর্বতকে অস্থিতিশীল রাখে, যা ভূমিধসের ঘটনা ঘটায়। ২০১৯ সালের এক জরিপে বলা হয়, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ আগের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে গলছে। আর্থ অবজারভেটরি অব সিঙ্গাপুরের পরিচালক বেঞ্জামিন পি হর্তন বলেন, ‘হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট।’
চীনেও আগের তুলনায় বন্যার ঘটনা বেড়েছে। গত বছর ব্রহ্মপুত্রে রেকর্ডসংখ্যক বন্যা হয় এবং শত শত মানুষের মৃত্যু ও কয়েক হাজার ঘড়বাড়ি ধ্বংস হয়। এশিয়ায় চীন একাই বাঁধের বিশাল এক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বনমুক্ত দেশ হিসেবে নিজেদের ঘোষণা দেওয়ার তাগিদ থেকেই এ বাঁধগুলো নির্মিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় দেশটি জানিয়েছে, তারা তিব্বতে সবচেয়ে বড় বাঁধ নির্মাণ করতে চাইছে।
