কভিড মহামারির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় নাগরিকদের মানসিক সমস্যার পাশাপাশি মাদকাসক্তি ও বন্দুক সন্ত্রাসের পরিমাণ আশঙ্কাজনক বেড়ে গেছে। তরুণেরা নানা ধরনের গ্যাং-এ জড়িয়ে সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, নির্ঝঞ্ঝাট মানুষেরাও সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। কানাডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর টরন্টোর এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে ‘শওগাত আলী সাগর লাইভের’ আলোচনায়।
কানাডার বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’-এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগরের সঞ্চালনায় সম্প্রচারিত ‘টরন্টোয় কেন এত বন্দুকযুদ্ধ’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা টরন্টোয় ক্রমবর্ধমান বন্দুক সন্ত্রাস, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তার প্রতিক্রিয়া ও তাদের করণীয় নিয়ে আলোকপাত করেন।
আলোচকেরা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের গ্যাং সংস্কৃতি থেকে দুরে রাখতে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেন। বলেন, যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার মতো সম্পর্ক সন্তানদের সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয় সময় বুধবার রাতে প্রচারিত আলোচনায় অংশ নেন অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. শিশির শাহন্ওয়াজ, বাংলা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী সাজ্জাদ আলী এবং ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মুনতাকা আহমেদ।
এ সময় অর্থনীতিবিদ ড. শিশির শাহন্ওয়াজ বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নানা রকমের সুযোগ-সুবিধায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসবাদের উসকানি দেয়। টরন্টোয় অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা কমিউনিটি এবং তাদের আবাসগুলোতেই সন্ত্রাসী তৎপরতা বেশি হচ্ছে।
বন্দুকের সহজলভ্যতাকে টরন্টোয় সন্ত্রাসের অন্যতম একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধপথে নানা ধরনের বন্দুক কানাডায় চলে আসে। এই সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বন্দুক সন্ত্রাস বন্ধ করা কঠিন হবে।
সন্ত্রাস বন্ধে ফেডারেল, প্রভিন্সিয়াল ও মিউনিসিপ্যালটি সরকারের যৌথ পদক্ষেপের তাগিদ দিয়ে বলেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসহ কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিকভাবে বন্দুক সন্ত্রাস বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী সাজ্জাদ আলী বিগত কয়েক বছরের সহিংসতার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেন, টরন্টো এখন রীতিমতো একটি আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে। কারো সাতে-পাঁচে নেই এমন সাধারণ মানুষেরা পর্যন্ত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
শহরের রিজেন্ট পার্কে গত সপ্তাহে তিনজন বাংলাদেশি কানাডিয়ানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, তারা সারা দিন কাজ করে নিজের বাসার পার্কিং লটে গল্প করার সময় সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলির শিকার হন।
কভিডে সরকারের অগ্রাধিকার পাল্টে গেছে বলে মত দিয়ে সাজ্জাদ আলী বলেন, সরকার মহামারি নিয়ন্ত্রণের দিকে পুরো মনোযোগ দেওয়ায় এবং সব ধরনের আর্থিক সুবিধা সেদিকে নিয়ে যাওয়ায় সন্ত্রাস দমনে মনোযোগী হতে পারেনি। ফলে সহিংসতা বেড়েছে।
সন্ত্রাস দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ধর্মীয় ও শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থীরা যাতে সশস্ত্র সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে সেদিক কড়া নজর দিতে হবে।
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মুনতাকা আহমেদ বলেন, মানসিক অসুস্থতা, গ্যাং, সন্ত্রাস এসব নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির অভিভাবকেরা কথা বলতে চান না। তারা মনে করেন— এগুলো অন্য কমিউনিটির বিষয়, আমাদের কমিউনিটিতে আসবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এগুলো কমিউনিটি বা গোত্র-বর্ণ দেখে আসে না।
সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে এ ছাত্র প্রতিনিধি বলেন, নিজের ঘরে, কমিউনিটিতে নির্ভরযোগ্য বন্ধু খুঁজে না পেলে তরুণ-তরুণীরা বাইরে বন্ধু খুঁজতে বেরোয়। এই সময়টায় তারা খারাপ বন্ধুত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
তরুণদের প্রতি তার পরামর্শ, তাদের উচিত নিজের ঘরে সব কথা বলার মতো পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া। অভিভাবকেরা প্রতিপক্ষ নন, সন্তানের মঙ্গল কামনা থেকেই নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ করেন। এটা মাথায় নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
