এ রায়ে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি: অভিজিতের স্ত্রী

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৭:১৮ পিএম

ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এ ছাড়া একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এক প্রতিক্রিয়ায় অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা জানিয়েছেন, এ রায় তার বা তার পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

মঙ্গলবার বিকেলে ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি বিবৃতি দেন মার্কিন প্রবাসী এ লেখিকা ও অ্যাকটিভিস্ট।

গত ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসির সামনে জঙ্গিদের হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিৎ রায়। স্ত্রী বন্যা অভিজিতের সঙ্গে ছিলেন এবং হামলায় তিনিও আহত হন। জঙ্গিদের চাপাতির কোপে হাতের একটি আঙুল হারান তিনি।  

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বন্যা বলেন, ‘ছয় বছরের সংশয় ও বিলম্বের পর আজ একটি রায় আমরা পেয়েছি। বিজ্ঞান, দর্শন এবং ধর্ম নিয়ে ব্লগ ও বই লেখার জন্য অভিজিতকে হামলাকারীরা হত্যা করেছে কী না সেটি বিচার করা হয়। এই বিচার আমার এবং আমার পরিবারের জন্য কোনো সমাপ্তি দেয়নি, আমি কোনোভাবে এমনটি প্রত্যাশা করিনি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘গত ছয় বছরে বাংলাদেশে মামলাটির তদন্তকারী কোনো ব্যক্তি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, যদিও আমি এ ঘটনার সরাসরি একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং হামলার শিকার। জানুয়ারি মাসে সরকারি আইনজীবী প্রকাশ্যে মিথ্যা বলেছেন যে, শুনানিতে আমি সাক্ষী হতে রাজি না। সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের বা বিচার প্রক্রিয়ার কোনো ব্যক্তি আমার সঙ্গে যোগাযোগই করেনি।’

হামলার দুই প্রধান হোতা সৈয়দ জিয়াউল হক এবং আকরাম হোসেন এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্ন তোলেন বন্যা। আরেক আসামি মুকুল রানা ওরফে শরিফকে বিচারবহির্ভূতভাবে (ক্রসফায়ার দিয়ে) হত্যা করায় সমালোচনা করেন তিনি।

অভিজিতের স্ত্রী বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ শরিফকে হত্যার আগে সে কয়েক মাস পুলিশ হেফাজতে ছিল। কেন শরিফ হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো? গত সপ্তাহে দীপন হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় হয়েছে। সেখানে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক হত্যাকারীর জবানিতে উঠে এসেছে, দেশে ২০১৫ সালে ব্লগার, প্রকাশক এবং সমকামীদের হত্যা করার জন্য অর্থ সরবরাহ করা হয়। আমি জানতে চাই, এ অর্থায়ন নিয়ে কে তদন্ত করেছে? কেউ কি আছে? যদি আমরা অর্থের উৎস বা হত্যার উৎস  সম্পর্কে জানতে না পারি তাহলে এসব রায় কী নিষ্পত্তি করবে?’

সেদিন বইমেলাতে বিজ্ঞান লেখকদের সঙ্গে একটি আড্ডার আমন্ত্রণ ছিল অভিজিৎ ও বন্যার। আড্ডা শেষে তারা হামলার শিকার হন। আড্ডার আয়োজকদের নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এ লেখিকা।

তিনি বলেন, ‘ইভেন্টটির আয়োজকেরা আমাদের কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে রেখেছিল। অবশেষে সন্ধ্যায় আমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হই। আর সন্ধ্যার পরেই আমরা হামলার শিকার হই এবং অভি নিহত হয়। ওই ইভেন্টের আয়োজকদের নিয়ে কি কোনো তদন্ত হয়েছিল? সেটির ফলাফল কী ছিল?’

বন্যার অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে বাক্‌স্বাধীনতা কীভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং যার জেরে সেক্যুলার লেখক, ব্লগার, অ্যাকটিভিস্ট দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। হেফাজত ইসলামের উত্থানের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

অভিজিতের স্ত্রী আরও বলেন, ‘কেবল কয়েকজন ফুট সোলজারের বিচার করা এবং উগ্রবাদের উত্থান ও এর শিকড় উপেক্ষা করা মানে অভির হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নয়; ব্লগার, প্রকাশক ও সমকামীদের হত্যাকাণ্ডেরও নয়। এই কারণেই এই রায়টি আমার বা তাদের পরিবারের জন্য শান্তি আনবে না।’

মঙ্গলবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন- আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান ও বরখাস্ত হওয়া মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, জঙ্গি নেতা আকরাম হোসেন ওরফে আবির ওরফে আদনান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন, আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম। তাদের মধ্যে পলাতক আছেন জিয়াউল হক ও আকরাম হোসেন।

এ ছাড়া ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

গত সপ্তাহে জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফীন দীপন হত্যা মামলায়ও একই আদালতে জিয়া, আকরাম, সোহেল ও মোজাম্মেলের ফাঁসির রায় হয়েছে গত ১০ ফেব্রুয়ারি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত