চলমান কভিড মহামারী পরিস্থিতিতে মুখোমুখি ক্লাস ও পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও মুখোমুখি ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। তবে গত বছর জুন মাস থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ বিভাগে একটি সেমিস্টার শেষ করে, পরের সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে; সেই সেমিস্টারের ক্লাসও শেষের পর্যায়ে। কিন্তু পরীক্ষা নিতে না পারার কারণে শিক্ষার্থীরা অফিশিয়ালি পরবর্তী সেমিস্টার বা বর্ষে উঠতে পারেনি। পরবর্তী সেমিস্টারে উত্তীর্ণ না হওয়া এবং পরীক্ষা না হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি একধরনের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। ক্লাসে যেতে না পারা, শিক্ষাজীবন ও পরীক্ষা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, সেশনজটের কারণে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ নিয়ে দুশ্চিন্তা ও হতাশা এবং মহামারীর কারণে সৃষ্ট আতঙ্কসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটও যে তীব্র আকার ধারণ করেছে তা সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যারা অনার্স শেষ বর্ষের এবং মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তাদের মধ্যে পড়ালেখা নিয়ে হতাশা এবং দুশ্চিন্তা বেশি। তাদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়েও হচ্ছে না। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় করোনা মহামারী স্বাভাবিক হলে পরীক্ষা নেওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ১ জুলাই থেকে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের প্রতিটি কোর্সকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে একাধিক পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তও যৌক্তিক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের অনলাইন সভায়ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এসেছে। তবে সেই সভায় পরীক্ষা নেওয়ার জন্য উপযুক্ত গাইডলাইন তৈরি করা, সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন এবং পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাম্য, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা বজায় রেখে অনলাইনে কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায় তা নিশ্চিত করা।
বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া যায়। যেভাবেই পরীক্ষা নেওয়া হোক না কেন, প্রশ্ন এমন হতে হবে যাতে হুবহু কোনো বই, আর্টিকেল বা অন্য কোনো ডকুমেন্ট থেকে কপি করে উত্তর করা না যায়। প্রশ্ন হওয়া উচিত এমন যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণী ক্ষমতা (analytical ability), ), প্রয়োগ (applying), , যুক্তির ব্যবহার ((reasoning)) ও মূল্যায়ন দক্ষতা ((evaluating) ব্যবহার করে উত্তর দিতে পারে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য শব্দ সংখ্যা নির্দিষ্ট (Word limit)) করে দেওয়া যায়; এতে নির্দিষ্ট আকারে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীকে নিজের ধারণা ব্যবহার করতে হবে।
‘ওপেন বুক এক্সাম’ পুরো বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পরীক্ষা পদ্ধতিতে ওপেন বুক এক্সামের ধারণা ব্যবহার করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা ইচ্ছেমতো বই, ডকুমেন্ট, আর্টিকেল দেখে উত্তর তৈরি করবে। তাতেও শিক্ষার্থীর অনেক কিছু শেখা হবে। গুগল ফর্ম ব্যবহার করে এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া যায়। এ ধরনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা ও পরিচালনা করা সহজ। তবে এমসিকিউ পরীক্ষায় বেশি নম্বর বরাদ্দ করা যাবে না। বিষয় সংশ্লিষ্ট আর্টিকেল এবং বই রিভিউ করতে দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থী রিভিউ লিখে অনলাইনে জমা দেবে। রিভিউ থেকে শিক্ষার্থীর বোধগম্যতা যাচাই করে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। কতগুলো ডকুমেন্ট বা আর্টিকেল পড়তে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পজিশন পেপার তৈরি করতে বলা যেতে পারে। ঐ বিষয়ে একাধিক মতামত ও ডকুমেন্ট পড়ে তার কী ধারণা তৈরি হয়েছে তা তার পজিশন পেপার থেকে বোঝা যাবে। পাশাপাশি পজিশন পেপারে শিক্ষার্থীর নিজস্ব মতামত দেওয়ার সুযোগও থাকবে, যেখান থেকে তাকে মূল্যায়ন করা যাবে।
সমস্যা সমাধান পদ্ধতিতেও শিক্ষার্থীদের প্রজেক্ট বা অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো সমস্যা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঐ সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে বলা যেতে পারে। এভাবে শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ দক্ষতা মূল্যায়ন করা যাবে। শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট আকারেও সমস্যার সমাধান করতে পারে।
প্রেজেন্টেশন পদ্ধতিতেও পরীক্ষা নেওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রস্তুতি নিয়ে সেটি অন্যদের সামনে উপস্থাপন করে। উপস্থাপন করার সময় শিক্ষার্থীর বিষয় সংশ্লিষ্ট ধারণা, মতামত, বোধগম্যতা ও উপস্থাপন কৌশল মূল্যায়ন করা যাবে। এছাড়া, তারা ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ তৈরি করেও পাঠাতে পারে যেখানে তারা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তাতে তাদের নির্দিষ্ট সময়ে অনলাইনে না এলেও চলবে। শিক্ষার্থীর বিষয় সংশ্লিষ্ট ধারণা, জ্ঞান ও বোধগম্যতা যাচাইয়ের জন্য ভাইভা নেওয়া যায়। ভাইভা পরীক্ষায় দেখে বলার সুযোগ নেই সেটি একটি সুবিধা। তবে সিনক্রোনাস পদ্ধতিতে অনলাইনে এসে পরীক্ষা দিতে হবে সেটি অনেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। যদি দলীয় কাজ দেওয়ার প্রয়োজন হয় এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় তাহলে গুগল ড্রাইভে একই ডকুমেন্টে কাজ করতে দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের কাজকে কোলাবোরেটিভ ডকুমেন্ট (ঈড়ষষধনড়ৎধঃরাব ফড়পঁসবহঃ) বলা হয়। কোলাবোরেটিভ ডকুমেন্টে একাধিক শিক্ষার্থী একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এতে দলীয় কাজে কোনো শিক্ষার্থী কতটুকু ইনপুট দিচ্ছে তা এডিট হিস্ট্রি দেখে সহজেই বোঝা সম্ভব। এছাড়া শিক্ষার্থীরা কপি পেস্ট করেছে কি না, কে কোন সময়ে কতটুকু কাজ করেছে শিক্ষক তাও ট্র্যাক করতে পারবেন এবং সেখান থেকে মূল্যায়ন করতে পারবেন।
প্রশ্ন অনলাইনে গুগল ফর্ম, গুগল ডক, পিডিএফ বা সাধারণ ওয়ার্ড ফাইল হিসেবে গুগল ক্লাসরুম, জুম, গুগল মিট, সার্ভে মানকি, ইমেইল বা অন্য যেকোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করা যেতে পারে। তবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য স্বাভাবিক পরীক্ষার থেকে বেশি সময় দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসে, ভিডিও ও অডিও চালু রেখে পরীক্ষা নেওয়া কঠিন। কারণ আমাদের দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী সেটি সম্ভব নয়। দেশের সবস্থানে নেটওয়ার্ক সবসময় ভালো থাকে না, বৈদ্যুতিক সংযোগও নিরবচ্ছিন্ন নয়। এমনকি সব শিক্ষার্থীর বাড়িতে বসেও পরীক্ষা দেওয়ার উপযুক্ত নেটওয়ার্ক ও পরিবেশ নেই। বিগত এক বছরে অনেক শিক্ষার্থীকেই দেখেছি ক্লাস করার উপযোগী নেটওয়ার্ক পাওয়ার জন্য বাজারে, বন্ধু বা আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছে। এমন সব কারণসহ আরও নানাবিধ কারণে পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে একসঙ্গে সব শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে পরীক্ষা নেওয়া কঠিন হতে পারে। তাই উত্তরপত্র পাঠানোর জন্য শিক্ষার্থীদের একটু লম্বা সময় দেওয়া যৌক্তিক বলে মনে করি। যেমন, এক ঘণ্টার পরীক্ষায় উত্তরপত্র পাঠানোর সুযোগ অন্তত ৩/৪ ঘণ্টা থাকতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা উত্তরপত্র পাঠাতে একটু বেশি সময় পাবে এবং যান্ত্রিক বা নেটওয়ার্ক সম্পর্কিত অন্য সমস্যা কাটিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। প্রশ্নের উত্তর কম্পোজ করে লিখতে গেলে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের প্রয়োজন। তাই শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর খাতায় লিখে ছবি তুলে বা পিডিএফ করে পাঠানোর সুযোগ থাকলে ভালো। এতে কারও যদি শুধু মোবাইল ফোন থাকে তাহলেও সে পরীক্ষা দিতে পারবে।
উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ((LMS) সফটওয়্যার যেমন, গুগল ক্লাসরুম, ক্যানভাস, ব্ল্যাকবোর্ড ইত্যাদি ব্যবহার করে পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি অনেক আগে থেকে প্রচলিত। তবে আমাদের দেশে বিষয়গুলো যথেষ্ট নতুন। তাই শুরুতে যত সহজ, পরিচিত ও নমনীয় পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া যায় সেটাই ভালো বলে মনে করি। করোনা মহামারীর কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের অনলাইন মোডে ক্লাস পরিচালনার সঙ্গে পরিচিতি এবং অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। এবং নিকট ভবিষ্যতে যে অনলাইন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা অর্জন করবে। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দক্ষতা- শিক্ষা কার্যক্রম ব্লেন্ডেড মোডে পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করতে হলে আরও অনেক সময়, পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ ও অর্থের প্রয়োজন হতো। মহামারীর প্রভাবে অর্জিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার এই দক্ষতা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মানের পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই দুঃসময়ের মধ্যে এটি অবশ্যই একটি ভালো খবর।
লেখক : শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
