যৌন নির্যাতনকারী বাংলাদেশি ইমামকে খুঁজছে ব্রিটিশ পুলিশ

আপডেট : ২৮ মে ২০২১, ১০:৫২ এএম

পেডোফিলিয়ায় (শিশুদের যৌন নির্যাতন) আক্রান্ত এক বাংলাদেশি ইমামের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তথ্য চাওয়ার কথা জানিয়েছে ব্রিটেনের পুলিশ। মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার সময় দুই শিশুকে যৌন নির্যাতনের দায়ে ১১ বছরের সাজা হওয়ার দিন, ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

ব্রিটেনের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের একটি মসজিদে ইমামতি করতেন হাফিজ রহমান নামের ৬৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি। ১৯৮০ সালের দিকে মসজিদে পড়তে আসা শিশুদের তিনি যৌন নির্যাতন করেন।

ভুক্তভোগীরা বড় হয়ে এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে তদন্তে নামে পুলিশ। শুনানির আগে হাফিজের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। কিন্তু চতুর হাফিজ ভুয়া পাসপোর্ট জমা দিয়ে পুলিশকে ধোঁকা দেন। পরে শুনানির আগের রাতে পুলিশ তার বাড়িতে গিয়ে জানতে পারে, হাফিজ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন।

ভুক্তভোগীদের শঙ্কা, হাফিজ আবার ব্রিটেনে ঢুকে থাকতে পারেন।

image

ব্রিটেনের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে লেখালেখির পর ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশ গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ মে) জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে হাফিজের বিষয়ে যোগাযোগ করছেন।

যেভাবে ফাঁস হলো হাফিজের ভয়ংকর অপরাধ: নাবিলা শর্মা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী ২০১৪ সালের দিকে এ বিষয়ে প্রথম মুখ খোলেন। এখন তার বয়স ৫০’র কাছাকাছি। বছর দুই বাদে ওলভারহ্যাম্পটন ক্রাউন কোর্ট তাকে ১১ বছরের সাজা দেন। তার বিরুদ্ধে আনা সাতটি অভিযোগের পাঁচটি প্রমাণিত হয় তখন।

বার্মিংহাম মেইলকে বুধবার নাবিলা বলেন, ‘তার ১১ বছরের সাজা হওয়ায় আমি খুশি। কিন্তু ধরা না পড়ায় সেই ভয় এখনো আমাকে তাড়া করে।’

‘আমার ক্ষোভ, ঘৃণা আমাকে স্থির থাকতে দেয় না।’

হাফিজের ব্যাপারে দেশ রূপান্তর অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পেরেছে, তিনি সাত সন্তানের পিতা। নাতি-নাতনি আছে ১০ জন। তবে বাংলাদেশে তার বাড়ি কোথায় সেটি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি।

হাফিজের পরিবারের দাবি, বাংলাদেশে যাওয়ার পর তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি তাদের। তার এক ছেলে বলছেন, বাবা মারা গেছে।

কিন্তু ভুক্তভোগীরা সেটি মানতে নারাজ। পুলিশেরও এই দাবির ব্যাপারে সন্দেহ আছে।

নাবিলা জানিয়েছেন, তার বয়স যখন ৭, তখন থেকে টানা ৪ বছর হাফিজ তাকে যৌন হেনস্থা করেছেন।

প্রথমে তার চুল এবং পোশাকের প্রশংসা করতেন হাফিজ। পরে একদিন আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। রুমে নিয়ে পোশাকে হাত দিতে চাইলে নাবিলা চিৎকার করে ওঠেন।

‘আমার বয়স তখন মাত্র ৭। বুঝতাম না সে কী করছে। আমাকে বাজেভাবে স্পর্শ করত। আমি ছাড়াতে পারতাম না।’

‘সবাই ভাবত মসজিদে আমি নিরাপদ। মাকে বলতে চেয়েও পারতাম না। একদিন সাহস করে তাকে চ্যালেঞ্জ করি। বলি, আর একবার হাত দিলে বাবাকে বলে দেব।’

‘এতে সে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। নিজেই বাবাকে ফোন দেয়। আমি অনেক ভয় পেয়ে যাই।’

হাফিজ এরপর নাবিলাদের বাড়িতে গিয়ে ডিনার করেন। ফেরার সময় তাকে পুরস্কার হিসেবে টাকা দেন!

এভাবে কেটে যায় কয়েক বছর। নাবিলা বলেন, ‘তখন ১১ বছর বয়স আমার। একদিন ইমাম আমাকে বিছানায় নিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল মরে যাচ্ছি। হঠাৎ সিঁড়িতে শব্দ হয়। তখন উনি আমাকে ছেড়ে উঠে চলে যায়।’

‘সিঁড়িতে সেদিন শব্দ না হলে আমাকে ধর্ষণের শিকার হতে হতো।’

নাবিলা সেদিন মাকে সব জানান। কিন্তু পরিবারটি তখন এগুলো নিয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করেনি।

নাবিলা বলছেন, ‘আমার বিশ্বাস সে এখনো বেঁচে আছে। পুলিশ তাকে ফিরিয়ে এনে সাজা দিক।’

হাফিজ যেভাবে বাংলাদেশে: ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে হাফিজ দুইবার গ্রেপ্তার হন। মামলা চলার সময় দুইবারই তিনি জামিন পান।

মিডল্যান্ডস পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পুরোনো নথি ঘেঁটে এই প্রতিবেদক দেখেছেন, হাফিজ সেই দিনগুলোতে আরও এক মেয়েকে যৌন হেনস্তা করেন। পুলিশের ধারণা, তিনি আরও অনেক মেয়ের সঙ্গে একই ধরনের অপরাধ করেছেন।

২০১৬ সালে শেষ দুই দিনের শুনানির সময় অসুস্থতার অজুহাতে হাফিজ আদালতে যাননি।

পাসপোর্ট পুলিশের কাছে থাকায় তাকে বাড়িতে অবস্থানের অনুমতি দেয়া হয়।

যেদিন তাকে সাজা দেয়া হবে, সেদিন পুলিশ তার বাড়িতে যায়। জামিন আদেশ ঠিকমতো মানছেন কি না, সেটি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন তদন্তকারীরা।

তখন পুলিশ বুঝতে পারে একটি এজেন্সির মাধ্যমে অন-ওয়ে টিকিট সংগ্রহ করে আরেকটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে হাফিজ চম্পট দিয়েছেন।

বিচারক নিকোলাস ক্যার্টরাইট সেদিন তার রায়ে বলেন, ‘হাফিজ আদালতে আসবেন না। তাই অনুপস্থিতিতেই সাজা হবে।’

ওই সময় পুলিশ বলে, ‘আমরা জানি ভুক্তভোগীরা হতাশ। ক্ষুব্ধ। এও জানি অপরাধী কোথায় আছে। তাকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত