গফরগাঁওয়ে তিন সেতু ধসে নদে, দুর্ভোগে ১০ গ্রামের মানুষ

আপডেট : ০৩ জুন ২০২১, ০১:০৮ পিএম

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার চরআলগী ইউনিয়নের বোরাখালী গ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদের শাখায় নির্মিত তিনটি সেতু ভেঙে পড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনটি সেতু ভেঙে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছে ১০ গ্রামের মানুষ।

অপরিকল্পিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেতুর পাশে খাল খননের কারণে নিচ থেকে মাটি সরে পানির চাপে তিনটি সেতুই ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত খননের কারণেই তিনটি সেতু ভেঙে পড়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেতু ভাঙার দায় নিচ্ছেন না। তারা একে অপরকে দোষারোপ করে যাচ্ছে।

গফরগাঁও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, সাত বছর আগে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বোরাখালী খালের ওপর ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ করা হয়।

আড়াই বছর আগে একই খালের ওপর ৩০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়। পাঁচ বছর আগে খালের আরেক স্থানে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্যের আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বোরাখালী খাল খনন কাজ শুরু করে।

ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সেতুগুলো দিয়ে ১০টি গ্রামের মানুষ যাতায়াত ও যানবাহনে পণ্য পরিবহন করত। সেতু ভেঙে

যাওয়ার ফলে গফরগাঁও ও হোসেনপুরের সঙ্গে অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

গ্রামের মানুষ কৃষিপণ্য, ধান ও চাল যানবাহনে পরিবহন করে উপজেলা সদরে নিয়ে যেতে পারছে না। অসুস্থ ব্যক্তি ও রোগীদের হাসপাতালে যেতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

তিনটি সেতু এক সাথে ভেঙে পড়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন চরহাজীপুর, বগামারা, রিকশাখালী, চরঝিনারি, টেকিরচরসহ প্রায় ১০ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

সেতু ভেঙে যাওয়াতে বর্ষা মৌসুমে বোরাখালী খাল পারাপারে চরম ভোগান্তিতে পড়বে গ্রামবাসী।

বোরাখালী গ্রামের আব্দুল মতিন মিয়া বলেন, গত ২৮ মে সন্ধ্যার দিকে বিকট শব্দে ভেঙে পড়ে বোরাখালী খালের ওপর নির্মিত সাত বছর আগের সেতুটি।

এর আগে ২৫ মে রাতে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতুটিও ভেঙে পড়ে। তার একদিন পর পাঁচ বছর আগে নির্মিত সেতুটিও ভেঙে যায়। সেতুগুলো ভেঙে পড়ায় এখন যাতায়াতে দুর্ভোগে পড়েছি আমরা গ্রামবাসী তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুগুলো নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

আছমা খাতুন নামের এক গৃহবধূ বলেন, সেতু থাকায় আমরা গফরগাঁওয়ে রিকশা ও ভ্যানে করে সহজে যাতায়াত করতে পারতাম। সেতুগুলো ভেঙে যাওয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে মানুষের ভোগান্তি বেড়ে গেল। তাই দ্রুত সময়ের মাঝে সেতুগুলো মেরামত করা দরকার। 

চরআলগীর কৃষক সরাফত আলী বলেন, সেতু পার হয়ে গ্রামের মানুষ উপজেলা সদর, হাসপাতাল ও হাট-বাজারে যাতায়াত করতেন। সেতুর কারণে দিনের কাজ দিনেই সেরে বাড়ি ফিরে আসা সম্ভব হয়েছে। এভাবে খাল খনন করা ঠিক হয়নি। সেতুগুলো ভেঙে যাওয়ায় আমরা এখন চরম দুর্ভোগে পড়েছি।

এ বিষয়ে চর আলগি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মাসুদ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল।

ভেঙে পড়া সেতুগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। আমরা ধারণা করছি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত খননের কারণেই সেতুগুলো ধসে পড়েছে।

সেতুর ঠিকাদার মাহমুদুল হাসান সজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেতুর নিচের তলদেশ থেকে পাঁচ ফুট গভীরে সেতুর বেস করা হয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড ৮-১০ ফুট করে খাল খনন করার কারণেই পানির চাপে সেতুগুলো ধসে পড়েছে।

এ বিষয়ে গফরগাঁও উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের না জানিয়ে খাল খনন কাজ শুরু করেছেন। সেতুগুলো নির্মাণের আগে খাল গুলো সরু ছিল। দরপত্রের সময় অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেতু নির্মাণ করেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সেতুগুলোর পাশে ৮ - ১০ ফুট গভীরে খনন করায় মাটি সরে গিয়ে পানির চাপে বেইজমেন্টে ফাটল ধরে সেতু ধসে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি আমরা জানিয়েছি। তাদের নির্দেশক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মুসা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেতু ভেঙে পড়ার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়ী। নদীতে সেতু নির্মাণ করতে হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি লাগে।

তারা কোন অনুমতি না নিয়েই পাইলিং ছাড়াই সেতু নির্মাণ করেছে। পাইলিং না করে সেতু নির্মাণ করায় সেতু ভেঙে পড়েছে। সেতু ভেঙে পড়ায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের দোষ আড়াল করতেই তারা এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দোষারোপ করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত