এইচএসসি পাসের পর ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাওয়া, পরে টাকার অভাবে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে না পারা চট্টগ্রামের ছেলে আশুতোষ নাথ এখন জগদ্বিখ্যাত দ্য ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মাশরুফ হোসেন আশুতোষ নাথকে নিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর লড়াকু এই যুবক প্রশংসায় ভাসছেন। শতশত মানুষ বলছেন, আশুতোষের গল্প তাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
হার্ভার্ডে পড়াশোনা করা মাশরুফ লিখেছেন, ‘পোশাকে (uniform) থাকা অবস্থায় ওনাকে যদি কখনো দেখি, পুরো সামরিক কায়দায় স্যালুট দেব, এই ইচ্ছে রাখি।’
‘দশটা স্যালুটও কম হয় এরকম একজন গুণী ব্যক্তির জন্য।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে আশুতোষের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। যে গল্প মাশরুফ হোসেন তার ফেইসবুকে লেখেননি, সেই গল্প আশুতোষ শুনিয়েছেন এই প্রতিবেদককে।
‘আমি একটি পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিলাম। শুধু পরীক্ষা দেয়ার টাকা ছিল। ভর্তি হওয়ার টাকা জোগাড় করতে না পারায় সেখানে পড়া হয়নি,’ আশুতোষ তবু জেদ ধরে রাখেন, ‘আমি কখনো হাল ছাড়িনি। পড়া চালিয়ে গেছি। তবে এখনো সফল হইনি। দেশের জন্য কিছু করতে পারলেই নিজেকে সফল মনে করব।’
আশুতোষ অনার্সের দিনগুলোতে চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার একটি কম্পিউটারের দোকানে পার্টটাইম কাজ করতেন।
পরে সংসার চালাতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কম্পিউটার কাম মুদ্রাক্ষরিকের চাকরি নেন। সরকারি এই চাকরিতে অনেক ব্যস্ততা থাকলেও আশুতোষ সব জয় করে নিজের মতো এগিয়ে গেছেন। পিএইচডিতে সুযোগ পাওয়ার পর শিক্ষাছুটি নিয়েছেন।
আশুতোষ বলেন, ‘আসলে সব সফলতার পেছনে একটা কষ্টের গল্প থাকে। তবে মানুষ যেভাবে আমাকে নিয়ে আলোচনা করছে, তাতে আমি অবাক। এটা এমন কিছু নয়। কত মানুষই তো পিএইচডি করে।’
আশুতোষের জন্ম ফটিকছড়িতে হলেও বড় হয়েছেন মানিকছড়িতে। মানিকছড়ি রানি নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০১০ সালে মানিকছড়ি গিরি মৈত্রী কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে রসায়নে বিএসসি করেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ( বুয়েট) থেকে রসায়নে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ইতিমধ্যে আশুতোষ নাথের গবেষণা বিষয়ে তিনটি আর্টিকেল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পিএইচডি করবেন মেডিসিন অ্যান্ড সিনথেটিক অরগানিক কেমিস্ট্রির ওপর।
আশুতোষ বিয়ে করেন ২০১৯ সালে। জীবনের নতুন ইনিংসে তার সতীর্থ হয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন স্ত্রী গান্ধী দেবী। তার আগের দিনগুলোতে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে গেছেন বড় ভাই।
‘আমরা দুইভাই, তিন বোন। আমি সবার ছোট। পরিবারের কেউ বেশি পড়ালেখা করেনি। আমার বড় ভাই-ই আমরা অনুপ্রেরণা। সব সময় উনি আমাকে সাহায্য করেছেন। করছেন।’
আশুতোষের বিষয়ে আরও তথ্য খুঁজতে গিয়ে টুইটারে তিন বছরের পুরোনো একটি পোস্ট চোখে পড়ে এই প্রতিবেদকের। এক বিদেশি গবেষককে তিনি ২০১৮ সালের ১৯ মে এভাবে টুইটে প্রশ্ন করেন, ‘আমি বাংলাদেশের ঢাকা থেকে বলছি। অরগানিক সিনথেসিসের মাস্টার্সের ছাত্র। আমি পিএইচডির জন্য আবেদন করতে চাই। কিন্তু আমার আইইএলটিএস নেই। কীভাবে আবেদন করব, দয়া করে আমাকে পরামর্শ দিন।’
এই টুইটের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে আশুতোষ হাসতে হাসতে জানান, এখনো তিনি আইইএলটিএস দেননি!
‘আইইএলটিএস না দেয়ার জেদ ছিল আমার। আমি কেন ইংরেজি ভাষায় পরীক্ষা দিয়ে ওদের দেশে পড়তে যাব। পৃথিবীর সব দেশ অন্যদের মাতৃভাষাকে সম্মান করে। আমার বিশ্বাস ছিল আইইএলটিএস না হলেও আমি পারব। শেষ পর্যন্ত পেরেছি।’
আশুতোষ গত মে মাসে ভিসা পেয়েছেন। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্ত্রীকে নিয়ে উড়াল দেবেন। যুক্তরাষ্ট্রে। নাহ…স্বপ্ন ছুঁতে…।
