২০২০-২১ অর্থ বছরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে চারুশিল্প ও থিয়েটার খাত থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠনকে অনুদান বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সক্রিয় অনেক সংগঠন এ বছর অনুদান পায়নি। কিন্তু ‘নাম-সর্বস্ব’ বিভিন্ন সংগঠনকে দেওয়া হয়েছে অনুদান।
এদিকে অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। শিগগিরই অনুদান বরাদ্দ প্রক্রিয়ার সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে বলেও দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
গত ৯ জুন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে দেশের ২৭০টি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে অনুদান মঞ্জুরি প্রদানের জন্য চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স অফিসারের কাছে তালিকা প্রেরণ করা হয়। যেখানে ১ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মঞ্জুরি প্রদানের কথা বলা হয়। সেই তালিকায় দেখা যায়, প্রাচ্যনাট, জীবন সংকেতসহ অনেক সক্রিয় সংগঠন অনুদানের জন্য বিবেচিত হয়নি। আবার সক্রিয় নয়, এমন অনেক সংগঠনকেও অনুদান দেওয়া হয়েছে।
প্রাচ্যনাটের সিনিয়র সদস্য সাইফুল জার্নাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৪ বছর ধরে নিয়মিত থিয়েটার চর্চা করে আসছে প্রাচ্যনাট। অথচ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ঘোষিত দীর্ঘ অনুদানের তালিকায় প্রাচ্যনাট নামটি নেই। এই অবিচারের প্রতিবাদ জানাই।
ভোলা থিয়েটার তাদের ফেসবুক পাতায় ‘সারেগামা সংগীত নিকেতন’, ‘স্বরলিপি সংগীত শিক্ষা কেন্দ্র’, ‘উদয়ন খেলাঘর’, ‘সূর্যতরুণ সাংস্কৃতিক সংঘ’, নবারুণ সাংস্কৃতিক সংঘ’ নামের ৬টি সংগঠনের কথা উল্লেখ করে লিখেছে, “অস্তিত্ববিহীন এই ছয়টি সংগঠন গত কয়েক বছর ধরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনটি সক্রিয় সংগঠন বরাদ্দ পায়নি।”
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে অনুদান প্রক্রিয়া সমন্বয়ের জন্য কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তবে সেই কমিটিতে থাকা সাংস্কৃতিক নেতারা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ে তাদের সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সারা দেশের যোগ্য অনেক সংগঠন পায়নি অনুদান।
বরিশাল বিভাগের বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজিদ। রবিবার দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, “বেশ কিছু সক্রিয় সংগঠন অনুদান পায়নি। আবার অনেক নাম-সর্বস্ব সংগঠন অনুদান পেয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়কে যেসব সংগঠনের জন্য সুপারিশ করেছি, বরাদ্দ তালিকায় তার প্রতিফলন ঘটেনি। এতে করে আমাদেরকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। অনুদানের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে নীতিমালার সংশোধন দরকার।”
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, “বিভিন্ন জায়গায় নাম-সর্বস্ব সংগঠনের অনুদানপ্রাপ্তির বিষয়টির ব্যাপারে আমরা জেনেছি। এখন কেউ কেউ সরাসরি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। যারা সরাসরি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তাদের ব্যাপারে আমরা না সূচক মতামত দিয়েছি। তাদের ব্যাপারে তো আমরা জানি না। মন্ত্রণালয় তাদেরকে কেন দিয়েছে, সেই ব্যাখ্যা দেবে নিশ্চয়। আমরা যাদের নাম প্রস্তাব করেছি, তারা যোগ্য সংগঠন।”
নাট্যদল অনুস্বর এর দলপ্রধান মোহাম্মদ বারী বলেন, “অনুদান নীতিমালা সংশোধন করা উচিত। যে প্রক্রিয়ায় অনুদান দেওয়া হচ্ছে, তাতে অনেক যোগ্য সংগঠনকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ১০ বছর আগে যে সংগঠন সক্রিয় ছিল, এমন অনেক সংগঠন বর্তমানে সক্রিয় নেই। আবার নতুন অনেক সংগঠন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অনুদান যেহেতু প্রতি অর্থ বছরে দেওয়া হয়, তাহলে শুধুমাত্র ওই অর্থ বছরের সক্রিয় সংগঠনকেই দেওয়া উচিত। পাশাপাশি অনুদান নেয়ার পর সংগঠনের কর্মকাণ্ডও জবাবদিহিতায় আনা উচিত।”
থিয়েটার বিষয়ক পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মাহফুজ সুমন বলেন, “অনেক সংগঠন ভালো কাজ করে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য অনুদান পায় না। আবার কাজ না করেও মন্ত্রণালয় বা জেলা প্রশাসনে ভালো যোগাযোগ রেখে অনুদান পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটাই আরও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।”
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব বদরুল আরেফীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, “সক্রিয় না থেকে যদি কোনো সংগঠন অনুদান পায়, সেটা দুঃখজনক। আমরা অভিযোগ পেলে পরবর্তী বছরে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। এখন করোনার জন্য গত এক বছর তো সব সংগঠনের কর্মকাণ্ডই স্থগিত রয়েছে। এ জন্য এ বছর সংগঠনের সক্রিয়তা বিবেচনায় আনা একটু কঠিন ছিল। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।”
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, “যোগ্য সংগঠন যদি অনুদান প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে থাকে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে ভাবা হবে। করোনার জন্য তো অনেক সংগঠনই সংকটে পড়েছে। অনুদান সমন্বয় কমিটিতে যারা আছেন, তাদেরকে নিয়ে আমরা শিগগিরই বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেব। আমরা যোগ্য সংগঠনকেই অনুদানের জন্য বিবেচনায় আনতে চাই।”
