১৪ কোটি টাকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনে ১৫ মাসেই ফাটল

আপডেট : ২৯ জুন ২০২১, ০৮:২৩ পিএম

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট নতুন চারতলা ভবন নির্মাণকাজে ব্যাপক ত্রুটি ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভবন নির্মাণের ১৫ মাসেই বিভিন্ন অংশে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ভবন নির্মাণ হয় বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা এ জন্য কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে দায়ী করছেন।

রবিবার (২৭ জুন) দুপুরে পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিন পরিদর্শন করে চারতলা ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা গেছে। নিচ তলায় রান্নাঘরের সামনের পিলার ও ভবনের প্রবেশ পথে একটি পিলারে ফাটল দেখা যায়। এ ছাড়া ভবনের ৩য় তলায় নার্সেস অফিসার্স কক্ষের বাইরের বারান্দার ওপরে রিন্টারে ও নিচের দেওয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে ভবনের আরো বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা যায়।

প্রসঙ্গত, পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর চারতলা ভবন নির্মাণকাজ উদ্বোধন হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ। 

স্থানীয়রা জানান, পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবন নির্মাণকাজের শুরু থেকেই শিডিউল অনুযায়ী কাজ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের মেসার্স কাসেম অ্যান্ড ব্রাদার্স। তবে উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাব-কন্টাক্টে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের কাজটি বাস্তবায়ন করেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার এক প্রভাবশালী। কাজের শুরুতে মাটির নিচে ৮৫ ফুট পাইল বসাতে গিয়ে ৭ থেকে ১০ ফুট ভেঙে যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শিডিউল বহির্ভূতভাবে কাজ বাস্তবায়ন করায় বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, অতি নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করলেও অভিযুক্ত ঠিকাদারের বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কক্সবাজারের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

অভিযোগ উঠেছে, পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবন নির্মাণে তদারকির দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মোরশেদ আলমকে ম্যানেজ করেই ঠিকাদারের লোকজন ‘যেনতেনভাবে’ কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবন হস্তান্তর করে।

তবে ওই প্রকৌশলী ‘ম্যানেজ’ হওয়ার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ১৪ কোটি টাকার বেশি বাজেটের পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৪তলা ভবন নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ পেয়েছিল চট্টগ্রামের কাসেম অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অন্য লোককে কাজটি ‘বিক্রি’ করে দেয়। আর সাব-কন্টাক্টে ভবনের কাজ করতে গিয়ে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী চারতলা ভবন নির্মাণে ৮৫ ফিট করে প্রায় দু শ পাইল বসানোর জন্য ঠিকাদারের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল নকশায়। তবে কাজের শুরুতেই নিম্নমানের পাইল তৈরি করায় তা মাটির নিচে বসানোর ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। পাইল বসাতে গিয়ে পাইলের উপরিভাগে যখন হ্যামারিং করা হয়, তখন ৮৫ ফিট পাইলের ৭ থেকে ১০ ফিট ভেঙে যায়। যেটুকু বসানো হয়েছিল, পাইলে তাতেও সেসময় ফাটল ধরেছিল। ভবন নির্মাণকাজের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি পাইলের মাথায় ফলস ক্যাপের মাধ্যমে মাটির গ্রাউন্ড লেবেল থেকে তিন ফুট নিচে বসানোর কথা, কিন্তু তা না বসিয়ে পাইলের মাথাগুলো মাটির গ্রাউন্ড লেবেলের ওপরে রেখেই চার থেকে পাঁচ ফিট ভেঙে রডগুলো হ্যাক্সো ব্লেড দিয়ে কেটে নেয়া হয়।  

এ বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ে কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোরশেদ আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, ‘বর্ষাকাল চলছে তাই ভবন বসে যাচ্ছে। হয়তো এ কারণে ফাটল সৃষ্টি হলেও তাতে ভবনের কোনো সমস্যা হবে না। এরপরও ফাটল সৃষ্টি হলে ঠিকাদারের মাধ্যমে ফাটলগুলো পুনরায় মেরামত করা হবে’। 

কক্সবাজারের বেসরকারি ফার্মে নিয়োজিত একজন নির্মাণ প্রকৌশলী সূত্রে জানা যায়, ‘প্রত্যেক ভবনেরই মূল চাপ বহন করে পাইল, আর এ ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী সঠিকভাবে পাইল তৈরি না হলে এবং সঠিক নিয়মে পাইল ড্রাইভ না করলে অবশ্যই যেকোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়’।

পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মোহাম্মদ ছাবের এ প্রসঙ্গে জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনে ফাটলের বিষয়টি তার জানা নেই। এরপরও ভবনে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে কি না তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। ভবনে ফাটল সৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া গেলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত