নানা জনশ্রুতি আর কিংবদন্তির কথা ধরলে অলিম্পিকের বয়স প্রায় তিন হাজার বছরের কাছাকাছি। ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে করা হয় ৭৭৬ খ্রিস্টপূর্বতেও গ্রিসের অলিম্পিয়ায় এই খেলার সূচনা হয়েছিল। তারপর প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হতো। বিশ্বযুদ্ধ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রবিপ্লবে কিছুদিন থেমেও থেকেছে অলিম্পিক। তবু যখনই শুরু হয়েছে তখন ক্রীড়া আর সম্প্রীতির পসরা নিয়ে মানুষের দুয়ারে হাজির হয়েছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ।’ এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। অলিম্পিকের হাজার হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। খেলার মাঠের যুদ্ধ, প্রেম, মহানুভবতার গল্পও অন্তরালে হারিয়ে গেছে। একমাত্র আলোচনায় আছে করোনা অতিমারীর মহাতঙ্ক। টোকিও অলিম্পিক এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরেও করোনার হাত থেকে নিস্তার নেই।
আকস্মিক কোনো মহাবিপর্যয় না ঘটলে জাপানের টোকিওতে ২৩ জুলাই থেকে শুরু হবে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ৩২তম আস। শেষ হবে ৮ আগস্ট। কিন্তু শুরুর আগেই করোনা ঢুকে পড়েছে অলিম্পিক ভিলেজে। করোনা পজিটিভ দুই অ্যাথলেট। তাই একটি নিরাপদ অলিম্পিকের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শুধু দুই অ্যাথলেটই নয়, জানা গেছে গেমসের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও ১৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবর। এদের মধ্যে ছিলেন গণমাধ্যমের দুজন, ঠিকাদার সাতজন এবং গেমসের পাঁচজন কর্মী । টোকিও অলিম্পিক প্রধান সেইকো হাশিমোতো বলেছেন, ‘যে অ্যাথলেটরা জাপানে আসছেন, তারা সম্ভবত চিন্তায় পড়ে গেছেন। আমি সেটা বুঝতে পারছি। এ কারণেই আমাদের সবকিছু খোলাসা করে বলা উচিত। কোনোভাবেই যেন করোনা ছড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করতে সবকিছু করছি আমরা। যদি ব্যর্থ হই, সে ক্ষেত্রে এর প্রতিকারের পরিকল্পনা যেন থাকে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’
টোকিও অলিম্পিক প্রায় দর্শকবিহীন ভাবেই মাঠে গড়াবে। আমন্ত্রিত অতিথিও হাজার খানেকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কদিন আগে থেকেই জাপানে পৌঁছাতে শুরু করেছেন বিভিন্ন দেশের অ্যাথলেটরা। এমন সময়েই নতুন করে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে গেছে আয়োজক শহর টোকিওতে। শহরটিতে গত চার দিন ধরে টানা এক হাজারের বেশি মানুষ কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন। আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫৫ ভাগ দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ। ধরে পড়েছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টও। এখনো পর্যন্ত জাপানে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২০% টিকার আওতায় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে জাপানের সাধারণ নাগরিকরা অলিম্পিক আয়োজনের বিপক্ষে। তাদের আশঙ্কা গেমসে অংশ নিতে ২০৫টি দেশের ১১ হাজারের বেশি অ্যাথলেট জাপানে আসবেন। এতেই ভয়ংকর হয়ে উঠবে করোনা। জাপানের সংবাদ মাধ্যমের দেওয়া তথ্যমতে ৫০ ভাগ টোকিওবাসী এখনই অলিম্পিক গেমস স্থগিত চান। সারা দেশের হিসাব ধরলে সেটা ৭৮ ভাগ। তবু জনমতের বিরুদ্ধে গিয়েও অলিম্পিক করতে হচ্ছে। আয়োজক কমিটির এক সদস্য কদিন আগে স্বীকার করেছেন আইওসি একপ্রকার বাধ্য করেই তাদের অলিম্পিক আয়োজন করাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে অলিম্পিক করায় ক্ষতির সম্মুখীন হবে আয়োজক সংস্থা। গ্লোবাল ডেটার হিসাব মতে ক্ষতির পরিমাণ আটশো মিলিয়ন ডলার।
এতসব নেতিবাচক খবরের মধ্যে আইওসি প্রেসিডেন্ট টমাস বাখ উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘টোকিও হলো অলিম্পিকের জন্য সবচেয়ে প্রস্তুত শহর।’
এই অলিম্পিক আয়োজনের মাধ্যমে জাপান তার প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথাও জানাতে চায়। সঙ্গে ক্রীড়া উৎকর্ষের প্রদর্শনীতেও পিছিয়ে থাকতে চায় না তারা। কিন্তু এসব কিছুর পথে বাধা হয়ে আছে করোনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিপর্যয়ের পর ১৯৬৪ সালে গ্রীষ্ম অলিম্পিক অয়োজন করে গোটা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল জাপানের টোকিও। এরপর ১৯৭২ এং ৯৮-তে তারা শীতকালীন অলিম্পিকের সফল আয়োজন করেছে। এবার ভিন্ন পরিস্থিতিতে আবার গ্রীষ্ম অলিম্পিক সফল করার চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে।
এবার টোকিও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক দেওয়া হবে অভিনব পদ্ধতিতে। জয়ীরাই সুনির্দিষ্ট স্থানে রাখা পদক নিজ হাতে গলায় পরবেন। এবারের গেমসে ৩৩৯টা স্বর্ণপদক দেওয়া হবে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনার উপায়ও নেই। বড় কোনো বিপর্যয় ছাড়া অলিম্পিক শেষ করতে পারলেই নিজেদের সফল মনে করবে দারুণ প্রস্তুতিতে অপ্রস্তুত হয়ে থাকা টোকিও।
