নারায়ণগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর কারখানাগুলো বছরে হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করলেও সেখানে এখন পর্যন্ত শ্রমিক ও শিল্পবান্ধব অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। নগরীর মাসদাইরে এ শিল্পনগরীতে একটু বৃষ্টি হলেই সড়কে জমে যায় হাঁটুপানি। অনেক কারখানায় পানি ঢুকে নষ্ট হয় মূল্যবান জিনিসপত্র। নালাগুলো অপ্রশস্ত এবং অনেক জায়গা ভরাট হয়ে শিল্পনগরীর পেছনের খালের বড় অংশ দখল হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকায় পানি জমে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মাসদাইর পাঁচতলা মোড় থেকে ৩নং গেট পর্যন্ত রাস্তাটি প্রায় সারা বছরই পানির নিচে ডুবে থাকে। এ সড়কটির উন্নয়নের জন্য বহুবার এলাকার জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলেও কোনো ফল মেলেনি। সরেজমিন দেখা গেছে, হাজার হাজার নারী-পুরুষ পোশাককর্মী প্রতিদিন এ রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করছেন। শীত মৌসুমসহ সারা বছরই রাস্তাটি ময়লা পানিতে ডুবে থাকে। এ ময়লা পানি পেরিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করেন শ্রমিকরা।
বিসিক শিল্পনগরীর একটি পোশাক কারখানার কর্মী সোনিয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশপাশের ডাইং এবং বাসাবাড়ির ব্যবহৃত পানি ড্রেন দিয়ে সরাসরি রাস্তায় এসে জমে যায়। ড্রেন দিয়ে পানি না যাওয়ায় সারা বছর ধরে মাসদাইর পাঁচতলা মোড় থেকে ৩নং গেট পর্যন্ত রাস্তাটি ময়লা কালো পানিতে তলিয়ে থাকে। সকালে গার্মেন্টসে যাওয়ার সময় পানি কিছুটা কম থাকলেও যখন দুপুরে খেতে যাই, তখন পানিতে ডুবে যায় পুরো রাস্তা। প্রতিদিন পানি মারিয়ে কাজে যাওয়ার ফলে অনেকেই ঠাণ্ডা, জ¦র ও চুলকানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’
আরেক পোশাককর্মী আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের চারবার এ পানি পার হয়ে যাতায়াত করতে হয়। একবার বাসা থেকে বের হয়ে গার্মেন্টসে আসি, এরপর দুপুর বেলা বাসায় খেতে যাই, আবার বাসা থেকে বের হয়ে গার্মেন্টসে আসি। ফের রাতে ছুটি দিলে বাসায় যাই। অনেক সাংবাদিক ভাইয়েরা এর আগে এখানকার ছবি ও ভিডিও নিয়ে গেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। আমাদের এ দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের, আমরা এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, আমরা কয় টাকা বেতন পাই। ময়লা পানিতে চলাচল করতে করতে অসুখে ধরে গেছে। এ পানি পাড়াইয়া আমাগো ঠাণ্ডা লেগে যায়। আমাদের ওষুধ খাইতে হয়। মালিক আমাদের ছুটি দেন না। আমরা অনেক ঝামেলার মধ্যে আছি। অনেক কষ্টের মধ্যে আছি। আমরা গরিব, আমাদের কেউ দেখে না। সারা বছর এভাবেই পানি মারিয়ে বিসিকের বিভিন্ন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজে যায় আমার মতো হাজার হাজার শ্রমিক।’
বিসিকের অবকাঠামোর বেহাল অবস্থা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের বিসিক খাল অবৈধভাবে দখল ও ভরাটের ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাস্তার পাশের ড্রেনটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পানি খালে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। ফলে বাড়ি-ঘরের প্রতিদিনের ব্যবহার্য পানি রাস্তার ওপর চলে আসছে। এই পানি যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জমে থাকা পানির ওপর দিয়েই আমাদের শ্রমিক ভাইবোনদের চলাচল করতে হচ্ছে। এটা খুবই অমানবিক একটা ব্যাপার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বন্ধু স্থানীয় সাংসদ, এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বার সবাই বিষয়টি অবগত আছেন। তারপরও কেন রাস্তার কাজ হচ্ছে না? পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। কেনই বা বিসিক খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং ভরাটকৃত অংশ খনন করে খালটি সচল করা হচ্ছে না তা আমার বোধগম্য নয়। খালটি এনায়েতনগর এবং কাশিপুর ইউনিয়নে পড়েছে। সেখানকার চেয়ারম্যানদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।’
