প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ‘হিল্লা বিয়ে’ থেকে রেহাই, স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেল দম্পতি

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২১, ০৭:৪৩ পিএম

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ‘হিল্লা বিয়ে’ থেকে রেহাই পেয়েছে পঞ্চগড়ের এক দম্পতি। এর ফলে দীর্ঘ তিন মাস পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে তারা। সামজপতিদের চাপে একঘরে হয়ে থাকা দম্পতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে এক সঙ্গে বসবাস শুরু করেছে। তাদের বাড়িতে আসতে শুরু করেছে পরিবারের সদস্য, পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরা।

জানা যায়, রাগের বশে মৌখিক তালাক দিলে ওই দম্পতিকে একঘরে করে রাখেন সমাজপতিরা।  নানা শর্তের কারণে গত তিন মাস ধরে তাদের সমাজচ্যুত করে রাখা হয়। পরে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ছলিমনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে স্থানীয় সমাজের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ওই দম্পত্তির ওপর সব বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

এ সময় দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রত্যয় হাসান, দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জামাল হোসেন, সুন্দরদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায়, ইউপি সদস্য লক্ষণ চন্দ্র রায়, মসজিদ কমিটির সভাপতি নাসিরউদ্দিন, সেক্রেটারি মোমিনুর ইসলাম, হাফেজ মোস্তফা কামাল, ছলিমনগর জামে মসজিদের সমাজ, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে হাফেজ মোস্তফা কামাল উপস্থিত থাকলেও মূল ফতোয়াদানকারী মুফতি আনোয়ার হোসাইন উপস্থিত ছিলেন না।

স্থানীয়রা বলছেন, বৈঠক শেষে প্রশাসনের কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পর সমাজপতিরা নানা আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। ওই দম্পত্তি ভুল করেছে বলে তাদের বকাঝকা করেন। বৈঠকে সমাজপতিরা তাদের মেনে নিলেও ওই দম্পত্তি ও তাদের পরিবারের লোকজন নানা আশঙ্কার কথা বলেছেন। ওই পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে জানায়।

ছলিমনগর মসজিদ কমিটির সভাপতি নাসিরউদ্দিন, সেক্রেটারি মোমিনুর ইসলাম জানান, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার একপর্যায়ে আয়নাল হক ও জমিরন বেগম একে-অপরকে মৌখিকভাবে তালাক দেওয়ার বিষয়টি উচ্চারণ করেছিলেন। এরপর বিষয়টি ওই গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পর স্থানীয় হাফেজ মোস্তফা কামালের সহযোগিতায় সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের ফুলবাড়ি বাজার এলাকার মুফতি আনোয়ার হোসাইনকে নিয়ে আসা হয়। মসজিদে বৈঠকে মুফতি আনোয়ার হোসাইন ও হাফেজ মোস্তফা কামাল বলেন, তালাক হয়ে গেছে। হিল্লা বিয়ে (কমপক্ষে তিন দিনের জন্য অন্যের সঙ্গে বিয়েতে আবদ্ধ হওয়া) দিতে হবে। স্বামী-স্ত্রী উভয়কে পৃথক থাকতে হবে। কারো সঙ্গে দেখা করা যাবে না। সমাজচ্যুত করতে হবে। সমাজের কারো সঙ্গে ওঠাবসা, কথাবার্তা বলা, জিনিসপত্র ও পণ্য আদানপ্রদান, কেনাকাটা, কাজকর্মে নেয়া যাবে না এমন সিদ্ধান্ত হয়।

তারা বলেন, ওই সিদ্ধান্ত শোনার পর সমাজের লোকজন তাদের একঘরে করে রাখে।

তারা আরো বলেন, ‘আমরা তো কোরআন-হাদিস অত ভালো জানি না, বুঝিও না। ওই মুফতি হাফেজ এসে ফতোয়া দিয়েছে হিল্লা বিয়ে না দিলে তাদের একঘরে করে দিতে। তাই আমরা তাদের একঘরে করে দিয়েছিলাম’।

ভুক্তভোগী স্বামী জানান, মুফতি হাফেজদের কথায় সমাজপতিরাও হিল্লা বিয়ে দিতে চেয়েছিল। হিল্লার জন্য পাত্রও ঠিক করা হয়েছিল। হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় গত দু-তিন মাস ধরে আমাদের একঘরে করে রাখা হয়েছে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। এমনকী নিজের সন্তানদেরও বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়নি। আমাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। ঈদে এক টুকরো কোরবানির মাংসও মেলেনি। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী আমির চাঁন আমার বাড়ির চলাচলের রাস্তাও কেটে দিয়েছে। সামাজের ভয়ে কেউ আমাকে কাজেও নেয়নি। দু-তিন মাস বেকার হয়ে খেয়ে-না খেয়ে বাড়িতেই কাটাতে হয়েছে। বিষয়টি মিমাংসার জন্য সামাজপতিদের দ্বারে দ্বারে সহানুভূতি চেয়ে অনুরোধ করলেও কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি সমাধান দিতে ব্যর্থ হন।

তিনি জানান, অবশেষে চেয়ারম্যানের পরামর্শে আমার স্ত্রী হাফেজ মোস্তফা কামাল, ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী, নাসিরউদ্দিন, আমির চাঁন, জুলহাস, সহিদ আলী, রাসেল ইসলাম, আমিনুর ইসলাম, মুফতি আনোয়ার হোসাইন, সুরমান আলীর নামে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেন। এর প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সমাজপতিরা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আমাদের মেনে নিতে বাধ্য হন। আমরা বিকেল থেকে একত্রে বসবাস করছি। বৈঠকের পরও সমাজপতিদের কেউ কেউ হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। কটূ কথা বলছেন। আমরা সহ্য করে আছি।

তিনি জানান, সমাজপতিদের চাপে দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আমতলী বাজারের মাওলানা জাহাঙ্গীরের বাসায় আমরা আবারও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। তারপরও সমাজপতিরা আমাদের একত্রে বসবাস করতে দেয়নি। যারা কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়ে অন্যায়ভাবে আমাদের সঙ্গে এমন করেছে আমরা তাদের বিচার চাই। যেন অন্য কারো সঙ্গে তারা এমনটি করতে না পারে। বৈঠকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আমরা কিন্তু এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

ভুক্তভোগী স্ত্রী বলেন, শুধু হিল্লা বিয়েতে আমি ও আমার স্বামী রাজি হইনি বলে সবাই মিলে আমাদের একঘরে করে দেয়। আমরা অনেক কষ্টে দিন পার করেছি। সমাজপতিদের হাত-পা ধরেছি, কেঁদেছি তবুও কারো মন গলেনি। আমাদের কোথাও যেতে দেয়নি। দোকান, হাটবাজার কোথাও যাইতে পারিনি। দোকানদারও আমাদের যেতে নিষেধ করে, স্থানীয় লোকজনও হুমকি-ধমকি দেয়। সমাজবাসী বলেছে আমাদের নাকি বয়কট করা হয়েছে। ছেলে-মেয়ে আত্মীয়-স্বজন-গ্রামবাসী কেউ আমাদের কাছে আসেনি। যারা আমাদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ করেছে তাদের যেন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।

সুন্দরদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায় জানান, আমি মুসলিম ধর্ম সম্পর্কে তেমন জানি না। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি সমাধান করে নিতে বলেছিলাম। কেউ আমার কথা শোনেনি। আসলে পরিবারটির ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। এ সময়ে এমন ধর্মান্ধতা মেনে নেয়া যায় না। পরিবারটি আমার কাছে গেলে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিই।  

দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জামাল হোসেন জানান, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সমাজপতিদের বুঝিয়ে ওই পরিবারটিকে সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছি। ওই এলাকায় কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মান্ধ কিছু মানুষ রয়েছে। তারা একটি হিল্লে বিয়েকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। এ ঘটনায় ইন্ধনদাতা ও ফতোয়াদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কেউ যদি অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চায় তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজপতিদের নিয়ে ছলিমনগর স্কুলে বৈঠকে বসেছিলাম। কোরআন হাদিসের আলোকে তালাক কীভাবে হয় বা হয় না এ বিষয়টি উপস্থিত সবাইকে বুঝাতে পেরেছি। বৈঠকে উপস্থিত সবাই তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এরপর আমরা ওই দম্পতিকে সমাজে ফিরিয়ে দিয়েছি। তারা একত্রে বসবাস শুরু করেছে। এরপরও যদি কেউ বাড়াবাড়ি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত