কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি, দুর্ভোগে পানিবন্দীরা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:০৫ পিএম

কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে করে পানিবন্দী হয়ে পড়া মানুষেরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।

শনিবার কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।   

এতে দুই শতাধিক চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার নতুন চরে বসতি গড়ে তোলা মানুষজন।

১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে এসব চরের মানুষ পানিবন্দী জীবন-যাপন করায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও গো-খাদ্যের সংকট। দীর্ঘ সময় পানিতে অবস্থান করায় হাতে পায়ে ঘাসহ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন পানি বাহিত রোগে।

শনিবার সরেজমিনে উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাডোবার চরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি অর্ধেক পানিতে ডুবে আছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি পরিবার ঘর-বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়ি ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিলেও, অধিকাংশ পরিবারই নৌকা ও ঘরের ভেতর উঁচু মাচায় শিশু-সন্তান পরিজন নিয়ে বসবাস করছে।

সেখানে নৌকা দেখে ত্রাণের আশায় ছুটে আশা মানুষজন জানান, প্রায় ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে এই চরের মানুষ পানিবন্দী হয়ে কষ্টে দিন যাপন করছেন। এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা পায়নি। হাতে কাজ না থাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছেন এসব চরের শ্রমজীবী মানুষেরা।

উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাডোবার চরের বন্যা কবলিত হাজেরা বেগম (৪০) জানান, এবারের বন্যার পানিতে তার ঘরের অর্ধেক তলিয়ে গেছে। বাড়ির পাশে বড় নৌকা আসতে দেখেই শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে একবুক পানি মাড়িয়ে নৌকার নিকট ছুটে এসেছেন।

সরকারি কোন সহায়তা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোন সহায়তা পাইনি। ঠিকমতো রান্না করতে পারছি না। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি।

হাজেরা বেগমের মতোই একে একে শিশু সন্তানদের কোলে নিয়ে বুক পানি পেরিয়ে নৌকার কাছে ছুটে আসেন হাবিজা, হাজেরা, আমেনাসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন মহিলা।

তারা জানান, ত্রাণের নৌকা ভেবে ছুটে এসেছেন তারা। কিন্তু সাংবাদিকদের নৌকা দেখে তারা নিরাশ হয়েছেন।

দক্ষিণ বালাডোবা চরের জুলেখা বেগম জানান, তিন সন্তানসহ পাঁচজনের পরিবারের দিন চলছে খেয়ে না খেয়ে। এখন পর্যন্ত কোন সহায়তাও পাননি তারা।

এই চরের বাসিন্দা মকবুল হোসেন জানান, চরাঞ্চল তলিয়ে থাকায় দিনমজুরি বন্ধ হয়ে গেছে। হাতে টাকা পয়সা নেই। হাটবাজার যেতে পারছি না। ঠিকমতো রান্না করতে না পারায় ছেলে-মেয়েদেরও ভালোভাবে খাওয়াতে পারছি না। এই চরের প্রায় শতাধিক পরিবারের বাড়ি-ঘরের অর্ধেক পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে আছে। শনিবার ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। সেটিও সবার ভাগ্যে জোটেনি। এই মুহূর্তে শুকনো খাবারের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, আমার ইউনিয়নের ২ হাজার পরিবার পানিবন্দী। বরাদ্দ পেয়েছি ৫ মেট্রিক টন চাল। যা ১০ কেজি করে পাঁচশ পরিবারের মাঝে শনিবার সকাল থেকে বিতরণ করা হচ্ছে।

প্রায় ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেগমগঞ্জের মতো একই অবস্থা উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী সরকার জানান, আমার ইউনিয়নের পানিবন্দী আড়াই হাজার পরিবারের চাহিদা পাঠিয়েছি। এর মধ্যে ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি যা বন্যা কবলিতদের তালিকা করে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, বন্যার্তদের জন্য ২৮০ মেট্রিক টন চাল ও সাড়ে ১২ লাখ টাকা বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ১৫শ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে যা বিতরণের কাজ চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত