চিনিশিল্প সচল রাখার কিছু সুপারিশ

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২০ পিএম

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য যখন সারা দেশে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপনের জোর দাবি উচ্চারিত হচ্ছে, তখন চিনি শিল্পের মতো ৬টি ভারী কৃষিভিত্তিক  শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল জাতির জন্য আত্মঘাতী। এ সিদ্ধান্তের ফলে আখ চাষি, চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি চিনির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভোক্তা সাধারণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতিকেজি চিনির মূল্য বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। বর্তমানে দেশে প্রতিকেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৮৭ টাকা দামে। এভাবে বাড়তে থাকলে  পণ্যটির দাম সেঞ্চুরি অতিক্রম করতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সুপারিশ অনুযায়ী জনপ্রতি বছরে ১৩ কেজি চিনি অথবা গুড় গ্রহণ করা প্রয়োজন। সে হিসেবে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টন চিনি ও গুড় প্রয়োজন। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৬ লাখ টন। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৬৮ লাখ টন চিনি আর ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন গুড়। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে দেশে বছরে ঘাটতি ১৪ লাখ টন। ঘাটতি পূরণের জন্য দরকার আরও বেশি গবেষণা ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। সে লক্ষ্যে বিএসআরআই কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আখের ৪৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে চিবিয়ে খাওয়া ও রস পান উপযোগী ৩টি, বন্যাসহিষ্ণু ৯টি, জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু ১০টি, খরাসহিষ্ণু ৭টি, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ৬টি জাত উল্লেখযোগ্য। আখের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ডাল, তেল, মসলা প্রভৃতি ফসল চাষের প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করেছে  সংস্থাটি। এ ছাড়া যেসব স্থানে অন্যান্য ফসল কম চাষ হয়, সেখানে চাষের উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খরা পীড়িত, বন্যাপ্রবণ, জলাবদ্ধতা, চর, হাওর, লবণাক্ত ও পাহাড়ি এলাকায় আখ চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চিবিয়ে খাওয়া ও রস পান উপযোগী জাতের আখ চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহও বাড়ছে। কিন্তু বিএসআরআই-এর এসব উদ্ভাবন কাজে লাগানোর যথাযথ প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। 

বিগত ৩/৪ বছর যাবত  আর্থিক সংকটের কারণে আখ চাষিদের আখের মূল্য সময় মতো পরিশোধ করতে পারছিল না দেশের সরকারি চিনিকলগুলো। এ ছাড়া গত বছর ও তার আগের বছর ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ  না পাওয়ার কারণে  আখ চাষের জন্য সময়  মতো সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করতে পারেনি অধিকাংশ চিনি কল। অন্যদিকে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ৬টি চিনিকল বন্ধের  আত্মঘাতী ঘোষণার ফলে  কৃষক আখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।  ফলে  গত ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে ১৫ টি চিনিকলে  সব চেয়ে কম পরিমাণ  চিনি উৎপাদিত হয় এবং কম উৎপাদনের কারণে  লোকসানে পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়। বেড়ে যায় চিনি উৎপাদন খরচ। এর আগে এত কম চিনি কখনো উৎপাদন হয়নি।  ৫ টি চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদ ক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন।  ২০১৯-২০ মাড়াই মৌসুমে  ৮৮হাজার ৮০০ এবং ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৬৮মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়।

‘র’ সুগার আমদানির বিষয়টিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের চিনির চাহিদার সিংহভাগ বেসরকারি চিনিকলগুলোর মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতেই বিশ^ব্যাপী কাঁচা চিনির দাম বাড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি টন ৩৪০ ডলারের মতো থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে  ৪৩০ ডলারের ওপরে। এ ছাড়াও গত এপ্রিল-জুলাইয়ে ব্রাজিলে চিনির উৎপাদন সাত শতাংশ পতনে বিশ^বাজারে চড়া দামেই স্থিতিশীল থাকে পণ্যটির বাজার দর। এর সঙ্গে দেশটিতে আগাম বরফ পড়ায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। পরিবহন জাহাজের ভাড়াও কয়েকগুণ বেড়েছে। সব মিলে চিনি আমদানির দর ঊর্ধ্বমুখীই থাকছে। আর এসব কারণেই অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির দাম বাড়ছে। ‘র’ সুগারের ক্রয়মূল্যের সঙ্গে বর্তমানে আমদানিতে প্রতি টনে শুল্ক কর দিতে হচ্ছে ২৪ হাজার ৪৬২ টাকা ও পরিশোধন ব্যয় ১০ হাজার টাকাসহ সর্বমোট খরচ ৭৫ হাজার ২৬২ টাকা। মিলগেটে রিফাইন্ড চিনির বিক্রয়মূল্য ৭৬ হাজার টাকা হলে ‘র’ সুগারের দাম বৃদ্ধির পরে জুলাই মাসে চিনির খুচরা মূল্য হওয়ার কথা ৮৫ টাকা। ফলে চিনির মূল্য স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে আমদানিতে ‘র’ সুগারের ওপরে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানায় বেসরকারি চিনি পরিশোধন কোম্পানিগুলো। চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি (০৯.০৯.২০২১) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চাপে চিনির নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রতিকেজি খেলা চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৭৪ টাকা ও প্রতিকেজি প্যাকেটজাত চিনির সর্বোচ্চ মূল্য ৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চিনির মতো একটি অত্যাবশ্যক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা পূরণে শতভাগ বৈদেশিক নির্ভরতা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। আখের অভাবে বর্তমানে বন্ধ ঘোষিত ৬টি চিনিকল আগামী ২/৩ বছরের মধ্যেও চালু করা সম্ভব হবে না। কয়টি চিনিকল নিয়ে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন কাজ চালিয়ে যাবে এ বিষয়ে সরকারকে শিগগির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চিনি শিল্প করপোরেশন চালু রাখলে নিম্নের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

১. চালু চিনিকলগুলোর কাঁচামাল আখ উৎপাদন ও সংগ্রহের স্বার্থে প্রত্যেক চিনিকলের প্রতিটি ইউনিট ও সাবজোনের সিডিএ ও সাবজোন প্রধানের শূন্য পদ অবিলম্বে পূরণ করতে হবে। ২. আখ রোপণ মৌসুমের শুরু থেকে (সেপ্টেম্বর মাস) আখ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কীটনাশক ও নালা কাটার জন্য নগদ ঋণ আখ চাষিদের মধ্যে সরবরাহ করতে হবে। ৩. জাত ও শ্রেণিভিত্তিক আখ রোপণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য গুণগত মানের বিশুদ্ধ বীজ উৎপাদন ও বিতরণ কাজ জোরদারও গতিশীল করতে হবে। ৪. আখ চাষের আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের জন্য প্রদর্শনী ক্ষেত স্থাপন, পদ্ধতি প্রদর্শন, ফলাফল প্রদর্শন, শস্যকর্তন, মাঠ দিবস, চাষি যোগাযোগ এবং খামার ও মাঠ পরিদর্শনের কাজগুলোর ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. কৃষি বিভাগের কর্মরত কর্মচারীদের বেতনভাতা ও সম্প্রসারণ কর্মকা-ের যাবতীয় খরচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতো সরকারকে রাজস্ব খাত থেকে বহন করতে হবে। ৬. মুড়ি ও রোপা আখ চাষে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। ৭. মিলে আখ সরবরাহের তিন দিনের মধ্যে আখের মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা  করতে হবে। ৮. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, শেকড়, আগাডগা ও আবর্জনামুক্ত সতেজ টাটকা আখ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ৯. আখ ক্রয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা মাড়াইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।  ১০. মিলে কর্মরত কেমিস্ট, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদদের প্রতিবেশী চিনি উৎপাদনকারী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ১১. দক্ষ প্যানম্যান তৈরির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষ প্যানম্যানদের ওপর চিনি উৎপাদন বহুলাংশে নির্ভর করে। ১২. বড় নদী ও সমুদ্র বন্দরের নিকটবর্তী কয়েকটি চিনিকলে আখের পাশাপাশি ‘র’ সুগার থেকে রিফাইন্ড সুগার উৎপাদনের বিষয়টি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। ১৩. দীর্ঘদিনের পুরাতন ও জরাজীর্ণ চিনিকলগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১৪. চিনিকলগুলোর উপজাত; মেলাসেস ও প্রেসমাড থেকে অ্যালকোহল, ভিনেগার ও জৈবসার প্রস্তুতের মাধ্যমে পণ্য বহুমুখীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক কৃষিবিদ ও কলামনিস্ট। সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত