চিকিৎসা দুর্বলতায় হামে মৃত্যুর মিছিল

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:২৫ এএম

দেশে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এখন ৮০০ ছাড়িয়েছে। হাম উপসর্গ নিয়ে গতকালও ছয় শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২৯ দিন, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার মাসে জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে ৮০৩ জনের। প্রথম দিকে হাম বা হাম উপসর্গে প্রাণহানি নিয়ে ব্যাপক হইচই হতো, তবে এখন অনেকটা যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। নীরবে চলছে মৃত্যুর ধারা। সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিনের প্রাণহানি যেন সাধারণ একটি পরিসংখ্যানের খবরে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময়ে ‘হামমুক্ত’ দেশে নতুন করে হামের সংক্রমণ এবং এত বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর কথা চিন্তাই করা যায় না। এর জন্য চিকিৎসার দুর্বলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন তারা। বলছেন, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে এত মৃত্যু হতো না। কেননা, হামের কারণে মৃত্যু হয় না, হামের কারণে সৃষ্ট অন্য জটিলতার কারণে আক্রান্ত রোগীর অবস্থা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা অন্য কোনো সমস্যায় মূলত মৃত্যুর মিছিল বেড়ে চলেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের নিউমোনিয়া হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে যতটা যতœসহ চিকিৎসা দরকার সেটি সবাই পায়নি। উপজেলা-জেলাপর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে।

দেশে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথম হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিষয়টি সবার নজরে আসে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিনের মাথায়। এরপর সরকার তড়িঘড়ি করে সক্রিয় হয়। দুই কোটির বেশি শিশুকে দেওয়া হয় হামের টিকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও প্রাণহানির তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। ২ এপ্রিল থেকে নিয়মিত তা সংবাদমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে। ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ জনের হামজনিত মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। পর দিন ৩ এপ্রিল নিশ্চিত করা হয় ১০৩ জনের মৃত্যুর তথ্য।

সরকারি হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগী পাওয়া গেছে এক লাখ ২০ হাজার ৩৫২ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৮৪১ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ৭৮ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৯৯ হাজার ২৯৪ শিশু। হামজনিত মৃত্যু হয়েছে ৮০৩ জনের। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ৯৫ জনের। বাকি ৭০৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ দিনে মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জন, ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ দিনে ২০৮, ৪ মে পর্যন্ত ৫০ দিনে ৩১১, ১০ মে পর্যন্ত ৫৬ দিনে ৪০৯, ২৩ মে পর্যন্ত ৬৯ দিনে ৫১২, ৩ জুন পর্যন্ত ৮০ দিনে ৬০১, ২৬ জুন পর্যন্ত ১০৩ দিনে ৭০২ জন এবং ২২ জুলাই পর্যন্ত ১২৯ দিনে ৮০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাসিক মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ জন, ২ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ২৩৪, ৩০ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৩১১ জন মারা যায়। জুনে মৃত্যু হয় ১৩৩ জনের এবং জুলাইয়ের ২২ দিনে মারা গেছে ৮৫ জন। এ পরিসংখানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মে মাসে। তারপর এপ্রিলে। মে মাসের তুলনায় জুনে প্রায় ৫৭ শতাংশ মৃত্যু কমেছে। তবে এখনো প্রতিদিন প্রাণহানির সংখ্যাটি উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামে কেউ মারা যায় না। হাম থেকে অন্য জটিলতা তৈরি হয়ে মারা যায়। হাম থেকে চেস্ট ইনফেকশন হতে পারে, যেটাকে বলে নিউমোনিয়া। হাম থেকে মেনিনজাইটিস, ডায়রিয়াও হয়। এগুলোর কারণেই সাধারণত রোগী মারা যায়। এগুলোর কার্যকর চিকিৎসা করতে হবে।’

প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেন, ‘ডায়রিয়া হলে মানুষ মরবে কেন? হাম হলে যে নিউমোনিয়া হয়, সেটি ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া। হামের জন্য ইমিউনিটি কমে যায়। সে জন্য ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া হয়। এ ধরনের নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করার ব্যবস্থা দেশে নেই? যথেষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি আছে, কিন্তু শিশুরা সেই চিকিৎসা পাচ্ছে না। আমরা ঠিকমতো চিকিৎসা দিতে পারছি না অথবা নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দিতে ভুল করছি। কিছু শিশুর আইসিইউর দরকার হয়, কিন্তু শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই। বক্তৃতাতে আইসিইউ আছে, বাস্তবে নেই। সোজা কথায় বললে, চিকিৎসার দুর্বলতার কারণে এত শিশু মারা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, হামের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর ঢাকা থেকে কয়েকজন শিশু বিশেষজ্ঞ সারা দেশের কয়েকটি হাসপাতালে পরিদর্শনে যান। রাজশাহী বিভাগের একটি টার্সিয়ারি হাসপাতালের উদাহরণ দিয়ে সূত্রটি জানায়, সেখানে গিয়ে তারা চিকিৎসার অবস্থা দেখে রীতিমতো হতাশ হয়েছেন। সেখানে ২৫ জনের বেশি সহযোগী অধ্যাপক আছেন। অথচ ওয়ার্ডে যাওয়ার পর রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, তারা কোনো সিনিয়র ডাক্তার চোখেই দেখেননি।

এই সূত্রটি জানায়, অভিযোগ নিয়ে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের প্রশ্ন করা হলে তারা দাবি করেন, রোগীদের একেবারে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। এ সময় তাদের আর কিছু করার থাকে না। হাসপাতালে আনার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই অনেকে মারা যায়। টার্সিয়ারি হাসপাতাল হওয়ার কারণে সেখানে বিভিন্ন জেলা সদর ও উপজেলা থেকে রোগীরা আসে। এসব রোগীর অনেকের অবস্থা খারাপ থাকে। দেখা যায়, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় অনেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেও যথাযথ চিকিৎসা পায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অরেকটি সূত্র জানায়, নিউমোনিয়া হলে ভালো যতœ দরকার। সেই যতœটা পায় না। আবার হাসপাতালের চারদিকে জীবাণু ঘোরে। সেখানে সহজেই সেকেন্ডারি ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে, কেউ কেউ সেই ইনকেশনের শিকার হয়ে যায়। ওখানে যখন অবস্থা খারাপ হয়, তখন পাঠিয়ে দেওয়া হয় টার্র্সিয়ারি হাসপাতালে। সেখানে গিয়েও যদি যতœটা ভালো পেত, তাহলে হয়তো রোগী টিকে যেতে পারত। কিন্তু সেখানেও যথাযথ যতœসহকারে চিকিৎসা না পাওয়ায় মারা যায়। এটা একটা সাইকেল। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সুস্থ হওয়া কিংবা মারা যাওয়ার মাঝখানের জার্নিটা রোগীবান্ধব না। এটাকে রোগীবান্ধব করতে হবে। তাহলে কি করণীয়? আন্তরিক হতে হবে। ওই রোগীর জায়গায় নিজেকে বা নিজের পরিবারকে চিন্তা করে চিকিৎসা দিতে হবে। পাশিপাশি সব ধরনের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দরকার।

দেশের হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই উল্লেখ করে সূত্রটি জানায়, নিউমোনিয়ার রোগীদের বেশি জটিলতা হলে আইসিইউ সাপোর্ট দরকার। হামের পরিস্থিতিতে বাবল সিপ্যাপ রেন্ডমলি ব্যবহার করা গেলে মেনিক্যাল ভেন্টিলেটরে নেওয়ার প্রয়োজন কমে যেত। তবে তাও সারা দেশে সেভাবে সম্প্রসারণ করা হয়নি।

আইসিডিডিআরবি থেকে জানা গেছে, হামের প্রকোপ শুরুর পর দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে ৩০ শতাংশের নিউমোনিয়া হয়েছে। এরপর নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বাবল সিপ্যাপের বিষয়টি তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অবহিত করেন। মন্ত্রীও এটি ইতিবাচকভাবে নেন। এরপর ৬০টি হাসপাতালে বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতি যুক্ত করা হয়। সেখানকার সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হামের কারণে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা ছয়শতাধিক শিশু বাবল সিপ্যাপ চিকিৎসা পেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর জীবন রক্ষায় বাবল সিপ্যাপ খুবই কার্যকর পদ্ধতি। দেশের সব হাসপাতালে এটি চালু করা গেলে প্রতি বছর নিউমোনিয়া আক্রান্ত অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষা সম্ভব হবে। এ পদ্ধতিতে খরচও হয় মাত্র ৩০০ টাকা।

এদিকে হাম উপসর্গে মৃত্যু সেভাবে না কমলেও আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে বলে জানান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জীবাণুবিদ (লিড ভাইরোলজিস্ট-এনপিএমএল ল্যাব) ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোগী কমছে, সামনে আরও কমে যাবে। স্যাম্পল আসা কমে গেছে। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ৭০০ আসত, এখন দুই থেকে ২৫০ স্যাম্পল আসছে। কিন্তু প্রাপ্ত স্যাম্পলের মধ্যে আক্রান্ত শনাক্তের হার আগের মতোই আছে। এটি এখনো ৩০ শতাংশ।’

তিনি বলেন, ‘কিছু শিশু টিকা নেয়নি। কিছু শিশু আছে, তাদের মায়েরাই টিকা দিতে নিয়ে যায়নি। টিকা না নিলে হাম আক্রান্ত কারও কাছাকাছি গেলে হাম হবেই। এ ঘটনাগুলোই ঘটছে। অনেকে টিকাকে গুরুত্ব দেয় না, তাদের টিকা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হবে। হামের প্রকোপের সময় বয়স্ক এবং ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুরও হাম শনাক্ত হচ্ছিল। এখন যাদের হচ্ছে, তাদের বয়স ৫ বছরের নিচে।’

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কম বয়সী শিশুর হাম থেকে রক্ষা করতে হলে মায়েদের টিকা দিতে হবে। কারণ এখন জন্মের পরপরই অনেক শিশুর হাম হচ্ছে। এসব শিশুর মায়েদের হামের ইমিউনিটি না থাকায় এমনটি হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, সন্তান নেওয়ার আগে মায়েদের হামের টিকা দেওয়া গেলে শিশুরা ইমিউনিটি নিয়ে জন্মাবে। তাদের ঝুঁকি অনেকটা কমে যাবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যাপক দৌড়াদৌড়ি করছেন। প্রধানমন্ত্রীও আন্তরিক। কিন্তু আমাদের মতো টেকনিক্যাল পারসনদের যুক্ত করা হচ্ছে না। কাজের কাজ কম হচ্ছে, কথা বেশি হচ্ছে।’

সম্প্রতি আইসিডিডিআরবির (আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ) ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও সিনিয়র ডিরেক্টর এবং ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি অ্যান্ড জিনোম সেন্টারের প্রধান ড. মোস্তাফিজুর রহমান এক সেমিনারে বলেছেন, এ বছর হাম পরিস্থিতি কেন নতুন করে দেখা দিয়েছে, তা বোঝা জরুরি। পাশাপাশি ভাইরাসের পরিবর্তন, টিকার কার্যকারিতা বা অন্য কোনো কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে কি না, সেটিও গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত