বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মানবাধিকারনীতি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। মাত্র ৩৮ শতাংশ কারখানায় চর্চা হচ্ছে সুশাসন। কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে মাত্র ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ কারখানায়। বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ৬০৩টি পোশাক কারখানায় সম্প্রতি ক্রিশ্চিয়ান এইড ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল শনিবার ‘জাতিসংঘের নীতিকাঠামোর আলোকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে শ্রম ও কর্ম পরিবেশের উন্নয়ন’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সভায় জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ আলোচনা সভা আয়োজন করে সিপিডি ও ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ। মূল প্রবন্ধে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ২০ দশমিক ২ শতাংশ মালিক কাজ করছেন। শ্রমিকদের ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ কারখানা। পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ সমস্যা নজরদারিতে রাখে এবং ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ কারখানা মালিক সুশাসনের প্রতিকার নিয়ে কাজ করেন।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মপরিবেশ বিশেষত শ্রমিকদের প্রতি কতটা সদয় মালিকরা এটা জানতে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। তথ্য সংগ্রহ করা হয় কারখানার শ্রমিক মালিকদের সঙ্গে কথা বলে।
জরিপে দেখা যায়, গত এক দশকে দেশে পোশাক খাত এগিয়ে গেলেও কারখানাগুলোর ভেতরে এখনো শ্রমিকদের ন্যায্যতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ততটা হয়নি। বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোতে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আমাদের দেশে এখনো পোশাক খাত বা অন্য খাতের শিল্প মালিকদের সঙ্গে শ্রমিকদের সম্পর্ক ভ্রাতৃপ্রতিম হয়নি। শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে সোচ্চার থাকে, তেমনি মালিক পক্ষও চাইবে বেশি উৎপাদন। তাই দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে দুপক্ষই লাভবান হতে পারে সে বিষয়টি খুঁজে বের করতে হবে।
শ্রমিকরা সুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে না পারলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের উৎপাদন সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন বাড়াতে পারলে মালিকপক্ষের লাভই বেশি। তাই মালিকপক্ষকে শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মো. ইহসান-ই-ইলাহী বলেন, গত দশ বছরে পোশাক মালিকরা অনেক সক্ষমতা অর্জন করেছেন। মালিকরা এখন নৈতিক দায়িত্ববোধের অবস্থানে অনেক সচেতন হয়েছেন। তবে শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ হলেও তা প্রত্যাশিত পর্যায়ে হচ্ছে না। শ্রম অধিকার পূর্ণ করতে না পারলে ২০২৪ থেকে ২৭ সালের মধ্যে আমরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হব।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বর্তমানে এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ক্রয় আদেশে দরপতন। এই দরপতনের কারণে আমরা শ্রমিকদের বেতন ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়টির নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।
শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা ও তাদের ঝুঁকি কমানোর বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য আমরা সরকার মালিক ও শ্রমিক ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছি। অনেক উন্নতিও হয়েছে। সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশের পোশাক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা উন্নত বিশ্বে পৌঁছে দিতে প্রচারণা চালিয়েছি।
আলোচনায় বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মো. হাতেম বলেন, বর্তমানে দেশের পোশাক খাতে আগের সেই পরিবেশ নেই। এখন কর্ম ও ঝুঁকি পরিবেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পোশাকের দরপতন আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।