বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় একটি বিড়ালের নাম ‘এশীয় সোনালি বিড়াল’। এই বিড়ালের গায়ের রং কমলা-সোনালি, কিন্তু এটি আরও অন্তত ৫ ধরনের রং ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশে এই বিড়ালটি দেখার রেকর্ড খুবই কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ক্যামেরা-ট্র্যাপ পদ্ধতির গবেষণায় ধরা পড়েছে এই বিড়ালের ছবি। তাতে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বনে এদের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।
মৌলভীবাজারের রাজকান্দি, পাথারিয়া, সাগরনাল, ভানুগাছ সংরক্ষিত বন, হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা, রঘুনন্দন এলাকায় এদের বিচরণ। সিলেট ও চট্টগ্রামের বনাঞ্চলকে সোনালি বিড়ালের বাসস্থান হিসেবে মনে করা হয়। তবে এই প্রজাতি বেশ বিরল।
সারা দেশে এমন বিড়াল দেখার নজির ১০টিরও কম। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশ তাদের ২০১৫ সালের হুমকি মূল্যায়নে সোনালি বিড়ালকে 'বিপদাপন্ন' ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে।
গবেষক দলের প্রধান ঢাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মুনতাসির আকাশ জানান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বনগুলো ভারতের সাথে সীমান্তে অবস্থিত। যা ভারতের ত্রিপুরা পাহাড়ের সঙ্গে সংযুক্ত। সীমান্তের এই অঞ্চল বন্যপ্রাণীদের জন্য ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পট হিসেবে পরিচিত। যদিও যেখানে সমন্বিত গবেষণা খুবই কম হয়েছে।
নর্থইস্ট বাংলাদেশ কার্নিভোর কনজারভেশন ইনিশিয়েটিভ (এনবিসিসিআই) নামে একটি মাংসাশী প্রাণী গবেষণা গোষ্ঠী এই বিড়াল এবং তার চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আবিষ্কার করেছে।
এই গবেষক আরও জানান, এশীয় সোনালি বিড়াল (Catopuma temminckii) একটি মাঝারি আকারের বিড়াল। এদেরকে ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনে দেখা যায়।
এসব বিড়ালের লেজের দৈর্ঘ্য ৪০ থেকে ৫৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এদের মাথা থেকে শরীরের দৈর্ঘ্য ৬৬ থেকে ১০৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর এই শ্রেণির বিড়ালের কাঁধ সাধারণত মাটি থেকে ৫৬ সেমি উচ্চতায় অবস্থান করে।
বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী ড. রেজা খান ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা থেকে একটি সোনালি বিড়ালের চামড়া সংগ্রহ করেন। আর বাংলাদেশের সোনালি বিড়ালের ওপর হওয়া একমাত্র গবেষণাটি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান।
২০০৮ সালের সেই গবেষণায় পার্বত্য অঞ্চলে বন্যপ্রাণী শিকারকে বিড়ালের অস্তিত্বের জন্য একটি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) নামে এক সংরক্ষণ এনজিও সাঙ্গু-মাতামুহুরির সংরক্ষিত বনে ক্যামেরা-ট্র্যাপ স্থাপন করলে সেখানে সোনালি বিড়ালের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
সিলেট বিভাগেও এ বিড়ালের হাতে গোনা দুটি রেকর্ড রয়েছে। ২০০৯ সালে সিলেটের মেঘালয় সীমান্তবর্তী একটি একটি গ্রামে 'কালো চিতা' ভেবে একটি সোনালি বিড়ালকে হত্যা করেন স্থানীয়রা। ২০১৭ সালে আরেকটি গবেষণায় মৌলভীবাজারের এক বনে এই প্রজাতির বিড়াল ধরা পড়ে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বনগুলো চরিত্রগতভাবে একইরকম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের প্রত্যেকটিতেই সোনালি বিড়াল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নিয়মিত সোনালি আবরণের বাইরে আরও পাঁচটি রং ধারণ করতে পারে এ বিড়াল। এসব রঙের আবরণকে বলা হয় মর্ফ।
বাংলাদেশে দেখা মেলা বিড়ালগুলোর মধ্যে এর আগে সোনালি, ধূসর ও কালো রঙের রেকর্ড পাওয়া গেছে। এবারই প্রথম দারুচিনি (লালচে বাদামি) রঙের বিড়াল আবিষ্কৃত হলো।
এশীয় সোনালি বিড়ালই এশিয়ার একমাত্র বহুরূপী বন্য বিড়াল। ২০১৯ সালে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের দিবাং উপত্যকায় ক্যামেরা-ট্র্যাপ থেকে করা এক গবেষণার পর প্রথম এই তথ্য আলোচনায় আসে। সেই গবেষণায় এক বনে ছয়টি ভিন্ন রঙের বন্য বিড়াল আবিষ্কৃত হয়েছিল।
এই বিড়াল এখন প্রায় বিপন্ন হওয়ার পথে জানিয়ে গবেষকেরা বলেন, অসংখ্য হুমকির শিকার এ বিড়াল এখন বিশ্বব্যাপীই বিলুপ্তির মুখে। আমাদের দেশে এই প্রজাতির সম্ভাব্য ব্যাপ্তি দুই হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও কম জায়গায়। আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি চামড়া ও পশমের জন্য শিকারিরা এসব বিড়ালের অস্তিত্বকেই মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এগুলো অন্যান্য ছোট বিড়ালের মতো নয়। ২০০৫ সালে উত্তর-মধ্য থাইল্যান্ডে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, একটি সোনালি বিড়ালই অন্তত ৩০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা দখল করে থাকে। আর খাবার সংগ্রহ থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ এরা দিনের মধ্যে করে ফেলতে পছন্দ করে। তবে বনের পরিধি কমে গেলে এরা আবাসস্থলের জন্য স্বল্প জায়গাতেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
এই বিড়ালের অবস্থান জানার ফলে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী বনগুলোর গুরুত্ব আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। এ অঞ্চলের চা বাগানগুলো সাধারণত বন্যপ্রাণীর করিডর হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
দেশে কৃত্রিম সাফারি পার্ক না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবহেলিত হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের এসব বনভূমি বাংলাদেশে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মডেল হতে পারে। আন্ত-সীমান্ত সংরক্ষিত এলাকা নির্মাণের জন্যও এগুলো সবচেয়ে আদর্শ জায়গা।
