পার্কের সাফারি কিংডমের একেবারে পশ্চিম প্রান্তের ধনেশ অ্যাভিয়ারিতে বেশ কিছু পাখির বসবাস। রয়েছে ব্ল্যাক সোয়ান, হোয়াইট সোয়ান, কালিম, ক্রাউন ফ্রিজেন্ট আর রাজ ধনেশসহ বেশ কিছু পাখির কিচিরমিচির ওড়াউড়ি চলে দিনভর। রয়েছে দেশি টুনটুনির বাসায় পাখির ছানা। আছে কিছু কবুতরের দাপিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য।
তবে সব ছাপিয়ে এক পাখি নজরে চলে আসে। মনে হবে যেন এক পাখির ভাস্কর্য। বৃহৎ আকার ও বিচিত্র ভাব নিয়ে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা পাখিটিকে ছুঁয়ে দেখতেও ইচ্ছে হতে পারে দর্শনার্থীদের। তবে ছুঁতে গেলেই বিপদ। বিশাল ও বিচিত্র ঠোঁটের একটা প্রচণ্ড আঘাত আসতে পারে মুহূর্তে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের নিঃসঙ্গ এ পাখিটি পেলিক্যান। বহুদিন সঙ্গীহীন এ পাখির দিন যেন কাটতে চায় না। যুগলহীন এ পাখিটি সারাক্ষণ রেগে থাকে। মাঝেমধ্যে রাগে উচ্চ শব্দে ডাকাডাকি করতে করতে উড়ে বেড়ায় ধনেশ অ্যাভিয়ারির এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে। খানিক পরেই চুপ করে বসে পড়ে ছোট্ট সেতুর নিচে।
সঙ্গীহীন এ পেলিক্যান পাখি একাকিত্ব দেখে দর্শনার্থীদের আক্ষেপের শেষে নেই। তাদের দাবি দ্রুত এ পাখিটির একটি সঙ্গী এনে জোড়া তৈরি করা হোক।
পার্ক কর্তৃপক্ষ জানান, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের পাখি এটি। এটি গ্রেট পেলিক্যান ও গ্রেট হোয়াইট পেলিক্যান নামেও পরিচিত। পৃথিবীতে যত বড় বড় পাখি আছে তাদের মধ্যে পেলিক্যান বিচিত্র স্বভাবের। বিচিত্র বৈশিষ্ট্য আছে শিকার ধরা, খাওয়া ও আকাশে ওড়ার বেলায়ও। এ দেশে আগে পরিযায়ী পাখি হিসাবে মাঝে মাঝে কিছু অঞ্চলে এদের দেখা পাওয়া যেত। তবে বহু বছর চোখে পড়ে না।
তারা জানান, শারীরিকভাবে ভালো আছে গ্রেট পেলিক্যানের একমাত্র এ সদস্যটি। স্বাভাবিক অবস্থায় এ পাখির থলির অস্তিত্ব বোঝা যায় না। পুরোপুরি ঠোঁট মেললে একে সুন্দর দেখায়। ঠোঁট একসঙ্গে করার সময় খুব শক্ত ঠোঁটের দুই অংশ থেকে ‘ঠক ঠক’ আওয়াজ আসে। হাঁসের মতো পায়ের পাতায় থাকা আঙুলগুলো জোড়া লাগানো। খাবার শেষে এরা আয়েশ করে চুপচাপ বিশ্রাম নেয়। তবে সঙ্গীহীন হয়ে পড়া এ পেলিক্যান পাখিটি একটু বেশিই চুপ থাকে।
পার্কের ওয়াইল্ড লাইফ সুপারভাইজার সরোয়ার হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ পাখির দুটি পাখনার অল্প একটু কালো জায়গা ছাড়া পুরো শরীর জুড়ে দুধ সাদা রং। ঠোঁটের রং হলদে ও ধূসর। ঠোঁটের দৈর্ঘ্য এক ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ঠোঁটের নিচের থলিটি হলুদ রঙের। এদের বিশাল পাখা। ফলে আকাশে উড়তে পারে প্রচণ্ড শক্তি ও গতি নিয়ে। এদের ওড়ার গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মাইল বেগ। উড়ন্ত অবস্থায় ২৫ থেকে ৪০ ফুট নিচের পানিতে শিকার দেখতে পায়। সুবিধামতো শিকার পেলে প্রচণ্ড গতি নিয়ে এরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশাল ঠোঁটে পানি থেকে শিকার তুলে নেয় তড়িৎ। পরে শিকারের সঙ্গে উঠে আসা পানি ঠোঁটের ফাঁক গলে ফেলে দেয়।
দর্শনার্থীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ ধনেশ অ্যাভিয়ারিতে অন্য পাখিদের দুরন্তপনা আমাদের আনন্দ দিলেও একাকিত্ব আর সঙ্গীহীন থাকা পেলিক্যান পাখিকে দেখে কষ্ট লাগে। এমন সুন্দর আর বড় একটি পাখি চুপসে থাকে সব সময়। কোনো চাঞ্চল্য নেই পাখিটির মাঝে।

সাফারি কিংডমের দায়িত্বে থাকা ওয়াইল্ড লাইফ সুপার ভাইজার আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, পেলিক্যানদের প্রধান খাদ্য হলো মাছ। এরা জলাশয়ে এমনকি সমুদ্রেও মাছ শিকার করতে পটু। এরা ঠোঁট দিয়ে শিকার করে খাবারগুলো প্রথমে থলিতে জমা রাখে পরে গিলতে থাকে। খাবার খাওয়া ছাড়াও এরা শত্রুকে ভয় দেখাতে বিশাল থলি মেলে ধরে ঠক ঠক শব্দ করে উচ্চ স্বরে। এদের বিশাল পাখার দৈর্ঘ্য পূর্ণবয়স্ক পাখির ক্ষেত্রে ৫-৬ ফুট হতে পারে। এসব পাখি দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। ডিম দেয় ২-৩টি পর্যন্ত। কিছু পেলিক্যান পানিতে সাঁতরিয়েও মাছ ধরে। বিশাল পাখা পানিতে ফেলে হাঁসের মতো সাঁতার কেটে মাছগুলোকে অগভীর পানিতে নিয়ে গিয়ে শিকার করে।
পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. তবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, পার্কে ধনেশ অ্যাভিয়ারিতে থাকা গ্রেট পেলিক্যান এ পাখিটি পুরুষ। পার্কের আনার কিছুদিন পরেই নারী পাখিটি মারা যায়। সেই থেকে একাকিত্ব নিয়ে সময় কাটে এ পেলিক্যান পাখিটির। নিয়মিত খাবার দেওয়া হয়। কখনো কখনো অভিমান করে কম খায়। তবে শারীরিকভাবে পাখিটি সুস্থ রয়েছে।
তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরাও চেষ্টা করছি এ পেলিক্যান পাখিটির একটি নারী সঙ্গী এনে জোড়া তৈরি করতে। আশা করি তা পারব। সঙ্গী পেলে আরো প্রাণবন্ত, খোশমেজাজে থাকতে পারবে এ পেলিক্যান পাখিটি।
