আপনি হয়ত আলঝেইমারস এবং ডিমেনশিয়া শব্দদুটোকে প্রায়ই পরস্পরের বদলে ব্যবহার করতে শুনেছেন এবং প্রতিটি শব্দের অর্থ আসলে কী তা নিয়ে বিভ্রান্তিতেও ভুগেছেন। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ এই দুটি রোগে আক্রান্ত হয় এবং এই রোগ দুটো মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি। বিশাল সংখ্যক পরিবার ধ্বংস হয় এই রোগে। আসুন তাদের খুটিনাটি সব জেনে নেওয়া যাক…
ডিমেনশিয়া এবং আলঝেইমারের মধ্যে পার্থক্য কী?
ডিমেনশিয়া একটি সাধারণ শব্দ, যা দিয়ে একজন ব্যক্তির সার্বিক মানসিক সক্ষমতার অবনতিকে বুঝায়। নানা কারণে এই মানসিক সক্ষমতার অবনতি হয়। যার মধ্যে একটি হল আলঝেইমারস, যা ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ রূপ। আলঝেইমারস হল স্মৃতিভ্রংশ। আর ডিমেনশিয়া সার্বিকভাবে বুদ্ধির বৈকল্য বা মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমে যাওয়াকে বোঝায়।
৬০-৮০% ডিমেনশিয়ার জন্য দায়ী এই আলঝেইমারস। যে কারণে কখনও কখনও ডিমেনশিয়া আর আলঝেইমারসকে একই মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবে আলঝেইমারস হল ডিমেনশিয়ার একটি বিশেষ রুপ।
ডিমেনশিয়া কি?
যখন একজন ব্যক্তির মানসিক সক্ষমতা এতটাই কমে যায় যে, তিনি আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন না তখন তাকে ডিমেনশিয়া বলে। ডিমেনশিয়া হলে মানুষের স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা, যুক্তি-বুদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
ডিমেনশিয়ার নানা প্রকার রয়েছে। যার প্রতিটি একটি নির্দিষ্ট ধরণের মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত, যা থেকে তাদের উপসর্গের ধরনও নির্ধারণ হয়।
ডিমেনশিয়াকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। তবে কিছু কিছু ডিমেনশিয়া দুই ভাগেই পড়ে:
১. কর্টিকাল ডিমেনশিয়া, যা গুরুতরভাবে স্মৃতিশক্তি ধ্বংস করে (আলঝেইমারস এর ক্ষেত্রে যেমনটা দেখা যায়)।
২. সাব-কর্টিক্যাল ডিমেনশিয়া, যা চিন্তার গতি এবং কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে (পারকিনসন রোগের ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়)।
আলঝেইমারস ছাড়া ডিমেনশিয়ার অন্য সবচেয়ে সাধারণ রূপ হল ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া। তবে এই দুটি রোগ ৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না।
ডিমেনশিয়ার অন্যান্য সাধারণ রূপগুলো হল ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া। এটি বেশিরভাগই ৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে দেখা যায়। মস্তিষ্কে প্রোটিন জমাট বাধার কারণে এক ধরনের ডিমেনশিয়া হয়। যার ফলে স্নায়ুগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডিমেনশিয়া একসময় চরম আকার ধারন করে।
আলঝেইমারস কী?
আলঝেইমারস হল ডিমেনশিয়ার একটি বিশেষ রূপ। এটি মস্তিষ্কের একটি ক্ষয়জনিত রোগ। মগজের কোষেগুলোতে ক্ষয়ের পর মস্তিষ্কের জটিল পরিবর্তনের কারণে এই রোগ হয়।
উচ্চ মাত্রায় প্রোটিন জট লেগে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ঘিরে ফেলে, এবং অনেক কোষের ক্ষয় ও মৃত্যু ঘটে। যার ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলোর নিজেদের মধ্যকার যোগাযোগ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সাধারণত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের কোষগুলো দেখা দেয় এই সমস্যা। হিপ্পোক্যাম্পাস হল শেখার এবং স্মৃতির কেন্দ্র। যার ফলে স্মৃতিশক্তি দূর্বল হয়ে আসে।
আলঝেইমারস থেকে ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলো দেখা দেয়। যেমন, শর্ট-টার্ম মেমোরি বা অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো কিছু ভুলে যাওয়া, বিল পরিশোধ করা বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট মনে রাখতে না পারা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণগুলো আরও খারাপ হয়ে উঠে। রোগী সঠিকভাবে কথা বলতে বা লিখতে, পোশাক পরার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো করতে বা আত্মীয় স্বজনদের মনে রাখার ক্ষমতা হারাতে পারে।
আলঝেইমারসে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি সহজেই বিভ্রান্ত এবং আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এবং কখনও কখনও রাগ দেখানো বা হিংসাত্মক আচরণ করতে পারে।
ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া কী?
ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া হল আলঝেইমারস রোগের পরে সবচেয়ে সাধারণ ধরনের ডিমেনশিয়া। রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়ায় মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই রোগ হয়।
কখনও কখনও লোকের ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া এবং আলঝেইমারস দুটো একসঙ্গেই হয়। যাকে ‘মিশ্র ডিমেনশিয়া’ বলে।
মস্তিষ্কের মধ্যে ভাস্কুলার সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তনালীগুলি ফুটো হয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে রক্ত মস্তিষ্কের কোষগুলোতে পৌঁছাতে পারে না এবং কোষগুলো শেষ পর্যন্ত মারা যায়।
মস্তিষ্কের কোষের এই মৃত্যু স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা বা যুক্তি-বুদ্ধিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যখন এই জ্ঞানীয় সমস্যাগুলো দৈনন্দিন জীবনের স্বভাবিকতা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট তীব্র হয়ে উঠে তখন একে ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া বলা হয়।
ভাস্কুলার ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্ট্রোকের মতো উপসর্গ, যেমন, পেশী দুর্বলতা, নড়াচড়া এবং চিন্তাভাবনার সমস্যা এবং মেজাজের পরিবর্তন, যেমন, বিষণ্নতা।
মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বিভিন্ন মাত্রার ক্ষতির ভিত্তিতে ভাস্কুলার ডিমেনশিয়ার বিভিন্ন প্রকারভেদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে স্ট্রোক-সম্পর্কিত ডিমেনশিয়া, সিঙ্গেল-ইনফার্কট এবং মাল্টি-ইনফার্কট ডিমেনশিয়া এবং সাবকর্টিক্যাল ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া।
ডিমেনশিয়ার স্তরগুলো কি কি?
ডিমেনশিয়া অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক লক্ষণ দিয়ে শুরু হয়। এই প্রাথমিক পর্যায়টি জ্ঞানীয় দুর্বলতা হিসাবে পরিচিত এবং খুব একটা বোঝা যায় না। একে অনেক সময় বিষণ্নতা মনে করে ভুল হতে পারে।
এই লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
চিন্তার গতি সামান্য কমে যাওয়া
পরিকল্পনা নিয়ে অসুবিধা
ভাষা নিয়ে সমস্যা
মনোযোগ এবং একাগ্রতা নিয়ে সমস্যা
মেজাজ বা আচরণগত পরিবর্তন
এই লক্ষণগুলো দেখলে বুঝতে হবে যে, ইতিমধ্যেই মস্তিষ্কের কিছু ক্ষতি ঘটেছে এবং লক্ষণগুলো আরও তীব্র হওয়ার আগে অবিলম্বে চিকিৎসা শুরু করা দরকার। নয়তো পরে চিকিৎসা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
পরিবর্তনগুলো প্রায়শই আকস্মিকভাবে ঘটে, যার মাঝখানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সময় থাকে। এই পরিবর্তনগুলো কখন ঘটবে তা আগেভাগে বলা কঠিন। তাই দ্রুত চিকিৎসা করানোটাই ভাল।
এর আরও সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে, চিনতে না পারা এবং বিভ্রান্তির বোধ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং মনোযোগে অসুবিধা, কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা এবং ব্যক্তিত্বের গুরুতর পরিবর্তন, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠা, হাঁটতে অসুবিধা হওয়া, প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে কষ্ট হওয়া, এবং অবাস্তব জিনিস দেখা।
প্রাথমিক আলঝেইমারের লক্ষণগুলোও প্রায় একইরকম, যেমন, প্রায়ই জিনিসপত্র হারানো, কথোপকথন বা ঘটনা ভুলে যাওয়া এবং পরিচিত পথের যাত্রায়ও হারিয়ে যাওয়া।
ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা
ডিমেনশিয়ার জন্য কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই এবং ইতিমধ্যেই মস্তিষ্কের যে ক্ষতি হয়েছে তা ফেরানোর কোন উপায় নেই।
তবে, চিকিৎসার মাধ্যমে মস্তিষ্কের ক্ষয়ের গতি ধীর করা যায় এবং এর চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল স্ট্রোকের মতো আরও বড় সমস্যা প্রতিরোধের চেষ্টা করা।
এ থেকে বাঁচার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, ওজন কম রাখা, ধূমপান না করা, ফিট থাকা এবং মদপান বাদ দেওয়া সহ ওষুধ খাওয়া এবং জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনতে হবে।
ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির মতো চিকিৎসাও বেশ উপকারী। তবে চিকিৎসা সত্ত্বেও ডিমেনশিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।
রোগ ধরা পড়ার থেকে ডিমেনশিয়া রোগীরা গড়ে প্রায় চার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকেন এবং বেশিরভাগ রোগী ডিমেনশিয়ার জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া বা পরবর্তী স্ট্রোকের কারণে মারা যান।
