তড়িঘড়ি করে নির্বাচন কমিশন আইন পাসে আস্থা সংকট হবে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, আইনের মাধ্যমে একটি ভালো নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠিত হচ্ছে বা হওয়া সম্ভব। তবে রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের মধ্যে এ বিশ্বাস তৈরি হওয়াটা জরুরি। এ জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন আইনে রাজনৈতিক ঐকমত্য লাগবে।
তারা বলেন, নাগরিকদের আস্থা অর্জনের জন্য দরকার ইসি গঠন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, অর্থাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, এ বিষয়ে মানুষের জানার সুযোগ করে দিতে হবে। এর জন্য নির্বাচন কমিশন গঠনে তড়িঘড়ি না করে ৪-৫ মাস সময় নেয়া উচিত।
‘প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন: জন-আকাঙ্ক্ষা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এই মতামত দিয়েছেন।
গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এবং সিটিজেনস ফর গুড গভর্ন্যান্স। বক্তারা ভার্চ্যুয়ালি অংশ নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
সাবেক সিইসি এ টি এম শামসুল হুদা, সাবেক কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক আবদুল আলিম প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনের মাধ্যমে ২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপনকে নতুন মোড়কে আনা হয়েছে। কোনো আলাপ-আলোচনা না করে সরকারের অনুগত অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নূরুল হুদার মতো বিতর্কিত ও অনুগতদের দিয়ে আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন করতেই অযৌক্তিক এই আইন করা হচ্ছে। সরকার প্রস্তাবিত আইনে কমিটির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কোনও বিধান নেই।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সুজন প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় অনুসন্ধান কমিটির কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিষয়টিই মূল বিষয়। খসড়ায় কমিটির কার্যাবলির স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য নামের তালিকা প্রকাশ এবং যাচাই প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের জন্য গণশুনানির বিধান রাখা হয়েছে। কমিটির নাম যাচাই প্রক্রিয়াকে পুঙ্খানুপুঙ্খ করার লক্ষ্যে দুই ধাপে নামের তালিকা প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় যাচাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। রাখা হয়েছে কমিটির সভার পূর্ণাঙ্গ কার্যবিবরণী এবং সদস্যদের ভোট প্রদানের তথ্য লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণের বিধান। কোনো নাগরিক যদি কমিটির সভার কার্যবিবরণীর অনুলিপি পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, তবে অনতিবিলম্বে তা প্রদান করার বিধান রাখা হয়েছে। এতে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত হবে।
ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, আমাদের প্রস্তাব ছিল অনুসন্ধান কমিটিতে সাবেক একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাখা। কারণ তার নির্বাচন পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে। কমিশনারদের কারও বিরুদ্ধে লিখিত-অলিখিত যে কোনো অভিযোগ থাকলেই তাকে বিবেচনা থেকে বাদ দিতে হবে। সুপারিশকৃত নামগুলো একটা পার্লামেন্টারি হিয়ারিং-এ যাবে, সেখানে আলাপ-আলোচনা হবে। কাদের নাম সুপারিশ করা হচ্ছে সেটা প্রকাশ করতে হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে দুটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। একটি হচ্ছে তিনি নিরপেক্ষ কিনা। দ্বিতীয়ত তার ভেতর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা ও সাহস রয়েছে কিনা। নির্বাচনে শতাধিক লোক মারা যাওয়ার পরও কমিশনাররা বলছেন আমাদের কোনো দায় নেই। এরকম ব্যক্তি এলে যেমন চলছে তেমনই চলবে। নাম সুপারিশের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টারি শুনানির বিষয়টি না থাকলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকবে না। সেক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুযায়ী প্রধামন্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা।
