রাষ্ট্র তো দর্শকের রুচি ঠিক করে দিতে পারে না: আশফাক নিপুণ

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০২:৪০ পিএম

গত বছর ২৫ জুন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে মুক্তি পায় আশফাক নিপুণ পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’। মুক্তির পর থেকেই দুই বাংলায় আলোচিত হয় ও ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় ওয়েব সিরিজটি। মহানগরের পর ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আরও কাজের পরিকল্পনা করছেন আশফাক নিপুণ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য বেশ কিছু কাজের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। একটা কাজ মোটামুটি ফাইনাল পর্যায়ে আছে, প্রি-প্রোডাকশনের কাজ চলছে। সামনে শুটিং এ যাব। এছাড়া এই মুহূর্তে লেখালেখি নিয়ে, সামনে কী কী কাজ, কীভাবে নতুন আঙ্গিকে করা যায় সেগুলো নিয়েই পরিকল্পনা করছি।’

একটি সিনেমার প্রি-প্রোডাকশনের কাজ করছিলেন এই পরিচালক। সিনেমাটির কাজ কোন পর্যায়ে রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার আগে সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে অনেক পরিকল্পনা চেঞ্জ হয়ে গেছে। লোকেশন, অ্যারেঞ্জমেন্ট সবকিছু মিলিয়ে শুট করাটা একটু কঠিন এখন। সিনেমাটা হবে অবশ্যই। পরিকল্পনা আছে এ বছরই কাজটা শুরু করার। প্রিপারেশনের ব্যাপার আছে। আবার মাঝখানে ওয়েব সিরিজের কাজ করতে হলো। সামনে আরেকটা করতে যাচ্ছি। তো আশা করছি সিনেমার কাজটা বছরের দ্বিতীয় ভাগে শুরু করতে পারব।’

কলকাতাতেও ‘মহানগর’ প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও প্রশংসা করেছেন। সামনের কোনো কাজে কলকাতার কাউকে নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি সবার আগে গল্পটা নিয়ে কাজ করি। কোনো গল্প সিলেক্ট করার পর যদি গল্পের ডিমান্ডে ওপার বাংলার কাউকে প্রয়োজন হয় তাহলে অবশ্যই কাজ করব, ভিন্ন ভাষার কাউকে নিয়ে করতে হলে সেটাও করব। গল্প ঠিক করার আগে কখনোই পরিকল্পনা করি না যে ওপার বাংলার আর্টিস্ট নিবো না এখানকার কোন কোন আর্টিস্ট নিবো। আমার প্রায়োরিটি সব সময় থাকে গল্পটা। কোন গল্পটা বলব, কেন বলতে চাই বা এই সময়ে গল্পটা কেন বলতে চাই বা গল্পটা সময়কে ধরতে পারবে কিনা –শুরুতে এসবই আমার মাথায় থাকে। কাস্টিংটা আসে একেবারে শেষের দিকে। তারও আগে টেকনিক্যাল ক্রুদের ঠিক করে তারপর আমি কাস্টিংয়ে যাই।"

বিদেশি ওটিটিগুলো দেশের মার্কেট দখল করলেও দেশীয় ওটিটিগুলো মার্কেট ধরতে পারছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশফাক নিপুণ বলেন, ‘ওটিটির বিষয়টাই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য নতুন। আমরা হয় টেলিভিশনের জন্য কাজ করে অভ্যস্ত। ওটিটির বিষয়টা টোটালই ডিফরেন্ট, এর মার্কেটিং ডিফারেন্ট, এর গ্রামার ডিফারেন্ট, এর স্ট্র্যাটেজি ডিফারেন্ট, এটা বানানোর যে প্রক্রিয়া সেটাও ডিফারেন্ট। তো গ্লোবাল ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে এগিয়ে গেছে ওই জায়গায় যেতে আমাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর তো একটু সময় লাগবেই। আমাদের নির্মাতাদের যেমন সময় লাগবে ওই মানের কনটেন্ট বানাতে তেমনি আমাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোরও সময় লাগবে রেগুলার নানান রুচির কনটেন্ট নিয়ে হাজির হতে। আমরা আমাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কথা বলছি, এক দুই বছর ধরে। কিন্তু হইচই বা অ্যামাজন প্রাইমের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো মিনিমাম চার পাঁচ বছর কাজ করে আজকের এই জায়গায় আসতে পেরেছে। আমাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও মিনিমাম ওই সময়টা দিতে হবে। আমাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরেকটা জায়গা ঠিক করতে হবে- তা হলো বাজেট নিয়ে কম্প্রোমাইজ না করা। আমার জানামতে একমাত্র চরকি হয়তো কিছুটা মেইনটেন করছে যদিও তাদের সঙ্গে আমার কাজ হয়নি এখনো। বাজেট একটা বড় ফ্যাক্টর। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক পলিসিই এ রকম যে আপনি লগ্নিটা সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাবেন না- এর জন্য সময় দিতে হবে। রাতারাতি ইনভেস্ট করে রিটার্ন আসার মাধ্যম এটা না। আমাদের এখানে অল্প বাজেটে একটা টিভি নাটক বানিয়ে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে টিভিতে চালিয়ে বাজেটের রিটার্নটা হয়তো সাথে সাথে ফেরত আনা যায় কিন্তু এই ফরম্যাট ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে না। এখানে বাজেটটা বাড়াতে হবে যাতে বিদেশি কনটেন্টের পাশাপাশি আমাদেরটাও দেখার আগ্রহ পান দর্শক। আমি হলিউডের কনটেন্টের কথা বাদই দিলাম, আমাদের পার্শ্ববর্তী তামিল, মালয়ালাম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গেও পাল্লা দিতে হলে আমাদের যে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো আছে তাদের বাজেটটা বাড়াতে হবে। এটা একদম প্রাথমিক শর্ত। আর রিটার্ন অবশ্যই আসবে। তবে সময় লাগবে। আর কোয়ালিটি মেনটেইন করতে পারবে যেসব ওটিটি তারাই টিকে থাকবে।

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে সরকার নীতিমালা করতে যাচ্ছে। এই নীতিমালা স্বাধীন নির্মাতাদের জন্য ভয়ের কিনা? জানতে চাইলে আশফাক নিপুণ বলেন, ‘যেকোনো ধরনের নীতিমালাই নির্মাতাদের স্বাধীন  শিল্প চর্চার উপর বাধা তৈরি করে। নির্মাতা হোক বা সরকার, সবাইকে আসলে দর্শকদের রুচিবোধের উপর নির্ভর করতে হবে। যে কনটেন্টটা ভালো হবে না সেই কনটেন্টটা দর্শকই রিজেক্ট করে দিবে। কনটেন্ট বিজনেসের চরিত্রই এটা। এসব নীতিমালা বা আইন তৈরি করা হয় মূলত নির্মাতা শিল্পীদের রুচিতে বিশ্বাস না করা বা দর্শকদের রুচিতে বিশ্বাস না করার কারণে। আমরা যত বেশি কন্ট্রোল করতে যাব তত বেশি বিষয়গুলো খারাপের দিকে যাবে। তাই কন্ট্রোল করতে যাওয়া ঠিক না। এখানে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শক নিজের সম্মতিতে মূল্য পরিশোধ করে সাবস্ক্রাইব করে দেখবে, ফ্রি তো দেখবে না। কাজেই তার রুচির উপর ন্যূনতম আস্থা তো থাকতে হবে। রাষ্ট্র তো দর্শকের রুচি ঠিক করে দিতে পারে না। তাই বলব, নিয়ম নীতিমালা আরোপ না করে দর্শক ও নির্মাতাদের রুচির উপর ভরসা রাখা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত