রাকাকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান ১৫ মানবাধিকার সংস্থার

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৫১ পিএম

বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিক কনক সরোয়ারের বোন নুসরাত শাহরীন রাকাকে মুক্তি দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে সাংবাদিক অধিকার সংস্থা সিপিজে সহ ১৫ মানবাধিকার সংস্থা।

বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিনের কাছে গতকাল (২৭ জানুয়ারি) পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে এই আহবান জানায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো। চিঠিটি আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও পাঠানো হয়।

চিঠিতে মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেলকে রাকার জামিন মুঞ্জুর এবং রাকার আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট আদালতের সঙ্গে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে ১৫টি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার সংস্থা। যাতে রাকা জেল থেকে অবিলম্বে মুক্তি পায়।

চিঠিতে বলা হয়, আমরা আপনাকে অনুরোধ করছি যে, কনক সারওয়ারকে তার সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত অযৌক্তিক অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে তার বিচারিক হয়রানি বন্ধ করুন। উপরন্তু আমরা বাংলাদেশ সরকারকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করার আহ্বান জানাচ্ছি, যদি এটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সংশোধন করা না হয়।

আমরা বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ পেয়েছি যে, কর্তৃপক্ষ রাকাকে তার ভাইয়ের ইউটিউব চ্যানেল কনক সারওয়ার নিউজ-এ সারওয়ারের বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনার প্রতিশোধ হিসেবে টার্গেট করা হয়েছে। রাকার ওপর নিপীড়ন ইঙ্গিত দেয় যে, কর্তৃপক্ষ সমালোচনামূলক রিপোর্টিং বন্ধ করার জন্য কঠোর উপায় অবলম্বন করবে, তা বাংলাদেশে হোক বা বিদেশে। আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের উপর তীব্র আক্রমণ তো চলছেই।

৫ অক্টোবর, ২০২১-এ র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সদস্যরা উত্তরায় রাকার বাড়িতে অভিযান চালায় এবং তাকে তার তিন নাবালক ছেলে সহ ব্যাটালিয়নের সদর দফতরে নিয়ে যায়।

রাকার তিন ছেলেকে প্রায় ৩০ ঘন্টা পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরিবার অভিযোগ করে যে, রাকাকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকে রাখা হয়। এই সময় তারা তাকে বারবার সারওয়ার সম্পর্কে প্রশ্ন করে এবং কেন তার ভাই বাংলাদেশ সরকারের বিরোধিতা করছে তা জিজ্ঞেস করে।

রাকার পরিবার আরও অভিযোগ করে যে, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সদস্যরা তার বিরুদ্ধে মেথামফেটামাইন নামের মাদক রাখার অভিযোগ আনার হুমকি দিয়েছে, যদি সে ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করার কথা স্বীকার না করে।

৫ অক্টোবর ২০২১-এ প্রকাশিত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন রাকাকে সারওয়ারের ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার ও ষড়যন্ত্র চক্রের সক্রিয় সদস্য’ হিসেবে অভিযুক্ত করে এবং তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে উল্লেখ করে। এ থেকে বোঝা যায় যে কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকের সঙ্গে রাকার পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিশোধ নিয়েছে।

একইদিনে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে রাকার বিরুদ্ধে একটি প্রথম তথ্য প্রতিবেদন দাখিল করে। যেখানে একটি প্রতারণামূলক ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা এবং সংস্থাগুলোর সমালোচনামূলক পোস্টের উল্লেখ করা হয়। অথচ রাকা নিজেই ১ অক্টোবর ২০২১-এ উত্তরা পশ্চিম থানায় ওই ভুয়া ফেসবুক আইডির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেছিলেন। ফেসবুক পরে ভুয়া বলে ওই অ্যাকাউন্টটি ডিলিট করে দেয়।

পরদিন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন রাকার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আরেকটি প্রাথমিক তথ্য প্রতিবেদন দাখিল করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় প্রতারণামূলক ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার এবং র‍্যাব সদস্যরা নিজেরাই অবৈধ মাদক ধরিয়ে দিয়ে মানুষকে আটক করে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমিটি অন ফরেন রিলেশন এর যে অভিযোগ রয়েছে তা থেকে আমাদের আশঙ্কা যে রাকার বিরুদ্ধেও ভুয়া মাদকের অভিযোগ আনা হয়েছে।

রাকাকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ৫০ জন বন্দীর সঙ্গে একটি উপচে পড়া কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। যেখানে তিনি বর্তমানে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠছেন। কিন্তু তিনি তার ছেলেদের যত্নে সহায়তা করতে পারছেন না। তার ছেলেদের মধ্যে একজন গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন।

এদিকে, ঢাকা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন প্রত্যেকেই যথাক্রমে কনক সারওয়ারের তথ্যের উৎস এবং সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে রাকাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ১২ ডিসেম্বর ২০২১ এবং ৫ জানুয়ারী ২০২২ তারিখে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিমান্ড আবেদন করে। তবে উভয় আবেদনই পরবর্তীতে খারিজ হয়ে যায়।

উপরন্তু, ২০২১ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্র ৫ বার আদালতে তার জামিনের শুনানি স্থগিত করেছে। ২৫ জানুয়ারি ২০২২ তারিখেও তাকে জামিন দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল কেন রাকাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জামিন দেওয়া হবে না। যে কারণে আমরা রাকার মৌলিক অধিকার নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের কনক সারওয়ারকে ভয় দেখানো ও হয়রানির প্রচেষ্টার কারণেও আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ২০১৬ সালে সারওয়ার বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সারওয়ারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে তার বিরুদ্ধে প্রথম তথ্য প্রতিবেদন দাখিল করেছে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাকে অভিযুক্ত করেছে। সারওয়ারের বিরুদ্ধে তিনটি মামলার অভিযোগই তার সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে জড়িত বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের সচেতন হওয়া উচিত যে নির্বাসিত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্য এবং সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপগুলো বিশ্ব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে গুম, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা শুধু রাকার স্বাধীনতাই নয় তার নিরাপত্তার জন্যও উদ্বিগ্ন। আমরা রাকাকে জেল থেকে বিচারপূর্ব জামিন দেওয়ার এবং সারওয়ারকে বিচারিক হয়রানি বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি।

আর, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ‘ভুলব্যবহার ও অপব্যবহার’ হয়েছে বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তাকেও আমরা স্বাগত জানাই। বাংলাদেশ সরকার যদি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের অধীনে নিশ্চিত হওয়া মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করতে না পারে, তাহলে আইনটি বাতিলের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে।

চিঠিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বিষয়ক যে ১৫টি সংস্থা স্বাক্ষর করেছে তারা হল:

১. অ্যাক্সেস নাউ

২. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

৩. অ্যান্টি ডেথ পেনাল্টি এশিয়া নেটওয়ার্ক

৪. আর্টিকেল নাইনটিন

৫. এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন

৬. ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রজেক্ট

৭. কোয়ালিশন ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ

৮. কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)

৯. হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

১০. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফেডারেশন (FIDH)

১১. ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট (IFJ)

১২. পেন আমেরিকা

১৩. পেন বাংলাদেশ

১৪. রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার (RSF)

১৫. রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত