চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তেল খালাসের দ্বৈত পাইপলাইন স্থাপনে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বসতবাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলায় এক প্রবাসী বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলার বারশত ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ব্যক্তির নাম মো. নুরুল আবছার (৪০)। তিনি উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের মৃত রেনু মিয়ার ছেলে।
আবছারের ভগ্নিপতি নুর হোসেন জানান, করোনা পরিস্থিতির আগে বিদেশ থেকে এসে পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন আবছার। কিন্তু ওই বাড়ির বেশির ভাগ অংশ তেল খালাসের পাইপলাইন বসানোর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়।
মঙ্গলবার সকালে ঠিকাদারের লোকজন পাইপলাইনের কাজ করতে সীমানা প্রাচীর ভাঙতে চাইলে তিনি বাধা দেন।
পরে বিকেল ৫টার দিকে ঠিকাদারের লোকজন গিয়ে আবছারকে থানায় যেতে বলেন। এদিকে আবছার থানায় যেতে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক্সকেভেটর দিয়ে ভেঙে ফেলা হয় সীমানা প্রাচীর। ওই সময় আবছারের স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন বাধা দিতে গেলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন তারা।
বিষয়টি স্ত্রী নিলুফা আবছারকে ফোন করে জানালে তিনি ফিরে এসে ঘরে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে ঘটনার পর পরই ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হলে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই এলাকার শত শত মানুষ বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেন।
খবর পেয়ে আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হুমায়ুন কবির, আনোয়ারা থানার ওসি এস এম দিদারুল ইসলাম সিকদার ও বারশত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম এ কাইয়ুম শাহ্ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বারশত ইউপি চেয়ারম্যান এম এ কাইয়ুম শাহ্ বলেন, বাড়ির সীমানা প্রাচীর ভাঙা নিয়ে ঠিকাদারের লোকজনের সঙ্গে আবছারের বাগ্বিতণ্ডা হয়। প্রাচীর ভেঙে ফেলার পর তিনি বিষপান করেন। আপাতত বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
জানা যায়, আমদানি করা তেল জাহাজ থেকে দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে খালাস করার জন্য গভীর সমুদ্রে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) নির্মাণকাজ করছে সরকার। এই মুরিং পয়েন্ট হচ্ছে মহেশখালীর মাতারবাড়ি থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গভীর সাগরে।
বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জি-টু-জি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিপিসির অধীনস্থ কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
সমুদ্রে ১৫৪ কিলোমিটার আর স্থলভাগে বসবে আরও ৭৪ কিলোমিটার দ্বৈত পাইপলাইন। পাইপলাইন দুটি কক্সবাজারের মহেশখালী, চট্টগ্রামের আনোয়ারা-কর্ণফুলী হয়ে উত্তর পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আসবে। গভীর সমুদ্র থেকে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের বেশির ভাগ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, আনোয়ারা অংশে পাইপলাইনে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো পাননি।
জেলা প্রশাসকের এলএ শাখায় অধিগ্রহণকৃত ভূমির ফাইল গোছানো হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়নি। ক্ষতিপূরণের টাকা না দিয়ে কাজ শুরু করায় এলাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের হয়ে আনোয়ারা অংশের কাজ দেখভাল করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিন শরীফ।
তিনি বলেন, মহেশখালী থেকে আসা আনোয়ারার বার আউলিয়া হতে কর্ণফুলীর ডাঙ্গারচর পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটারের বেশি দ্বৈত পাইপলাইন নির্মাণের মাটি কাটার কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠান। মঙ্গলবার বোয়ালিয়া এলাকায় কাজ করার সময় আবছার নামে এক ব্যক্তির সীমানা প্রাচীর অধিগ্রহণে পড়ে। সেখানে কাজ করতে গেলে তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পুলিশকে অবহিত করা হয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের জনসংযোগ কর্মকর্তা আমিনুর রহমান বলেন, অধিগ্রহণকৃত ভূমির ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এলএ শাখা দেখছেন। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শুধু পাইপলাইন বসানোর কাজ করছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আনোয়ারায় কাজের তদারকি করছেন স্থানীয় আমিন শরীফ।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম দিদারুল ইসলাম সিকদার বলেন, বিষপানের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। আমরা জানতে পারি পাইপলাইন বসানোর জন্য স্থানীয় আবছারের বসতবাড়ি অধিগ্রহণ করা হয়।
সেখানে ঠিকাদারের লোকজন সীমানা প্রাচীর ভাঙাকে কেন্দ্র করে আবছার বিষপান করেন। তবে তিনি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন কি না জানি না।
