ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা আজ ২৩তম দিনে গড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই কোন শান্তি চুক্তির কথাটা কিছুটা বিস্ময়কর ব্যাপার বলেই মনে হতে পারে। তবে মনে হচ্ছে একটি রূপরেখার প্রেক্ষাপট ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার কথা হয় এ দুই নেতার। এরদোগান পুতিনকে প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলনস্কির সঙ্গে পুতিনকে কথা বলিয়ে দিতে চান।
এরদোয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপের সময় নিজের কিছু শর্তও তুলে ধরেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এরদোয়ানের প্রধান উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিন এ ফোনালাপ শুনেছেন এবং সেখানে কি আলোচনা হয়েছে সেটি তিনি বিবিসির জন সিম্পসনকে বলেছেন।
শর্তগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কালিনের মতে, প্রথম চারটি শর্ত মেনে নেয়া ইউক্রেনের জন্য খুব কঠিন কিছু হবে না।
এসবের মধ্যে প্রধান শর্তটি হচ্ছে, ইউক্রেনকে নিজেদের নিরপেক্ষ ভূমিকা মেনে নিতে হবে এবং তারা কখনোই নেটোতে যোগ দেয়ার চেষ্টা করবে না। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এরই মধ্যে এটি মেনে নেয়ার কথাও বলেছেন।
প্রথম ভাগের অন্যান্য শর্তগুলো হচ্ছে- ইউক্রেনকে একটি নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যার মাধ্যমে প্রমাণ হবে যে তারা রাশিয়ার জন্য কোন হুমকি নয়। ইউক্রেনে রুশ ভাষাকে সুরক্ষা দিতে হবে, এবং দেশটিকে রাশিয়ার ভাষায় ‘ডি-নাজিফিকেশন’ অর্থাৎ নাৎসীমুক্ত বা উগ্র জাতিয়তাবাদীদের কবল থেকে মুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয় ভাগের শর্তগুলো তুলনামূলক জটিল। কালিন জানান, ফোন কলে পুতিন বলেছেন কোন সমঝোতায় পৌছানের আগে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে মুখোমুখি বসতে চান। জেলেনস্কিও এরমধ্যে জানিয়েছেন যে তিনিও রুশ প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনার জন্য প্রস্তুত।
তবে সেই আলোচনার শর্তগুলো নিয়ে খুব পরিষ্কার করে কিছু বলতে চাননি কালিন। তিনি শুধু বলেছেন যে এগুলো মূলত পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চল এবং ক্রিমিয়া সংক্রান্ত।
মারিওপোলের থিয়েটারে উদ্ধারকাজ চলছে
ওদিকে উদ্ধার কর্মীরা মারিওপোলে একটি থিয়েটারের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
ছবিতে থিয়েটারটির ভয়াবহ চিত্র দেখা গেলেও যে কয়েকশ বেসামরিক নাগরিক সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলো তারা বোমাবর্ষণের আগেই সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
‘আমরা জানতাম আমাদের সেখান থেকে পালাতে হবে কারণ শিগগিরই ভয়াবহ কিছু সেখানে ঘটতে যাচ্ছে’, ৩৮ বছর বয়সী কেট বলছিলেন। তিনি একদিন আগে তার ছেলেসহ সেখান থেকে সরে পড়েছিলেন।
অন্যদিকে রাশিয়ান বাহিনী ক্রিমিয়ার দিক থেকে ইউক্রেনের দক্ষিণে আরও অগ্রসর হয়েছে। তারা কিয়েভকে ঘিরে ফেলে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে শহরটির বড় অংশ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণেই আছে।
জার্মানির কাছে জেলেনস্কির দাবি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জার্মান সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছেন নতুন ধরণের এক জার্মান দেয়াল তৈরি হয়েছে যা ইউরোপকে মুক্তি ও দমন-পীড়নে বিভক্ত করেছে।
রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমর্থন দেয়ায় তিনি অবশ্য দেশটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে তিনি জার্মান জ্বালানি নীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সমালোচনা করেন যা তার মতে বিভক্তির দেয়াল তৈরিতে সহায়তা করছে।
তারা বিশ্বাস করেনি যে প্রতিবাদটি ছিলো আমার আইডিয়া
রাশিয়ার টিভি সাংবাদিক ম্যারিনা ওভসান্নিকভা রাশিয়ান টিভির সংবাদ চলাকালে যুদ্ধবিরোধী পোস্টার দেখিয়েছিলেন।
এরপর তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি বলছেন যারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তারা বিশ্বাসই করেননি যে এভাবে প্রতিবাদ করাটা একেবারেই তার নিজের আইডিয়া।
ওভসান্নিকভা বলেন রাশিয়ার প্রোপাগান্ডা মেশিন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াটা তার দরকার ছিলো।
ইউক্রেন থেকে ভুয়া কল পাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা
অন্তত দুজন মন্ত্রী জানিয়েছেন তারা এ ধরণের কল পেয়েছেন ইউক্রেন থেকে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেন ওয়ালেস এজন্য ‘রাশিয়ান নোংরা কৌশল’কে দায়ী করে বলেছেন যে এক ব্যক্তি তাকে কল করে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল বলেছেন একই ধরণের কল তিনিও পেয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী অবশ্য কিভাবে ওই তাকে কল করতে পারলো তা নিয়ে তাৎক্ষনিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
রাশিয়ান অলিগার্কের ইয়ট জব্দ
রাশিয়ান একজন অলিগার্ক বা ধনকুবেরের বিলাসবহুল একটি ইয়ট অচল হয়ে পড়েছে নরওয়েতে। কারণ কেউ এর জন্য জ্বালানি বিক্রিতে রাজী হচ্ছে না।
সাবেক কেজিবি এজেন্ট ভ্লাদিমির স্ট্রহালকভস্কি এই ইয়টের মালিক এবং তিনি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সে তালিকায় তার নাম নেই।
রাশিয়ার হামলায় মারিওপোলের ৯০ শতাংশ ধ্বংস
ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মারিওপোল রুশ বাহিনীর হামলায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। মারিওপোলের নগর কর্তৃপক্ষ এ দাবি করেছে।
টুইটারে ইউক্রেনের আইনপ্রণেতা (এমপি) লেসিয়া ভাসিলেঙ্কো মারিওপোল ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেন।
অবরুদ্ধ মারিওপোলে রুশ বাহিনীর নির্বিচারে বিমান হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আকাশ থেকে হামলা করে এই শহর ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে’।
বুধবার দিবাগত রাতে মারিউপোলের একটি থিয়েটার হলে আশ্রয় নেওয়া এক হাজারের বেশি মানুষের ওপর বোমা হামলা করে রুশ বাহিনী।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত থিয়েটার হলের ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় দেড়শ মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, তা জানা যায়নি।
এদিকে যুদ্ধবিষয়ক মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার অন্য কোনো শহরে রুশ সেনারা উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। তবে রুশ সামরিক বাহিনীর ক্রমাগত হামলার মুখে ইউক্রেনের দক্ষিণের বন্দরনগরী মারিউপুল আগামী সপ্তাহগুলোর মধ্যে পতনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রুশ সেনাদের অগ্রাভিযান থেমে থাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা মূল্যায়নে একই তথ্য দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন এই থিঙ্ক ট্যাঙ্কটি আরও বলেছে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার রাজধানী কিয়েভের আশপাশে রুশ বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে এবং খারকিভ অঞ্চলে রুশ আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
এছাড়া ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে এবং গত বুধবারই ১০টি রুশ বিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইউক্রেনে ২২ দিনের অভিযানে নিহত ৭ হাজার রুশ সেনা
টানা ২২ দিনের যুদ্ধের ইউক্রেন সেনাদের পাল্টা আঘাতে নিহত হয়েছেন প্রায় ৭,০০০ রুশ সেনা। গুরুতর আহতের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র উদ্ধৃত করে বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন সে দেশের সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস।
তবে ইউক্রেনের দাবি, তারা এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা করেছে। রাশিইয়া অবশ্য এ ব্যপারে কিছু বলেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী কিয়েভ-সহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহর রক্ষা করার জন্য সংখ্যা এবং সমর-সম্ভারে প্রবলতর প্রতিপক্ষ রাশিয়ার বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ভলোদিমির জেলেনস্কির বাহিনী।
কিয়েভকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে ঢোকার চেষ্টা করছে রুশ সেনারা। কিন্তু জায়গায় জায়গায় যে ভাবে ইউক্রেনীয় সেনা এবং সাধারণ নাগরিকের যৌথবাহিনী নিরাপত্তার বলয় তৈরি করেছে তাতে রাজধানী শহরের ভেতরে ঢুকতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে রুশ সেনাদের।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামল এক হাজার চেচেন সেনা
রাশিয়ার হাত শক্ত করতে ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দিল চেচেন প্রজাতন্ত্র। ইতিমধ্যেই এক হাজার চেচেন সেনা ইউক্রেনে ক্রেমলিনের হয়ে সামরিক সঙ্ঘাতে যোগ দিতে গিয়েছেন। চেচেন প্রজাতন্ত্র রাশিয়ারই একটি অংশ।
চেচেন নেতা কাদিরভ বৃহস্পতিবার বলেন, ‘চেচেন প্রজাতন্ত্রের এক হাজার স্বেচ্ছাসেবক ইউক্রেনকে নাজিবাদী এবং সেনাবাদী চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত করতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে’।
আপটি আলাউদিনভ নামে তার বিশ্বস্ত অনুচর এই অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও কাদিরভ জানান। এর আগে বহু বার কাদিরভের বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
