স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন আইনমন্ত্রীর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২২, ১১:৪৩ এএম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২২’ পেলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা মরহুম অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক।

আইনমন্ত্রী সরকারি সফরে দেশের বাইরে থাকায় তার ভাগনে ব্যারিস্টার শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম বৃহস্পতিবার  ঢাকায় আয়োজিত  অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে মরহুম সিরাজুল হকের পক্ষে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করেন।

এবার জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নয় বিশিষ্ট ব্যক্তি ও দুই প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করেছে সরকার।

সিরাজুল হকের পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায়। বাবার কর্মসূত্রে তার জন্ম ১৯২৫ সালের ১ আগস্ট সাতক্ষীরায়। তিনি খুলনা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুনরায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি  অর্জন করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন সিরাজুল হক। তারা কলকাতায় বেকার হোস্টেলে থাকতেন। সিরাজুল হক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ স্বাধিকার আন্দোলন, উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন কুমিল্লা জেলার কসবা-বুড়িচং নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে এমএনএ নির্বাচিত হন। সিরাজুল হক ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যান এবং সেই থেকে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে বাংলাদেশের যে প্রতিনিধিদল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেন তার অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৭২ সালে গঠিত গণপরিষদের সংবিধান কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন সিরাজুল হক। পরের বছর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কসবা ও আখাউড়া নিয়ে গঠিত তৎকালীন কুমিল্লা-৪ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে বঙ্গভবনে খুনি খন্দকার মোশতাক তৎকালীন এমপিদের নিয়ে এক বৈঠকের আয়োজন করেন। উক্ত বৈঠকে সিরাজুল হক প্রথম ব্যক্তি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি বলা যায় না মর্মে দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করেন।

সিরাজুল হক উপমহাদেশের প্রখ্যাত আইনজীবী ছিলেন। তিনি ১৯৫৭ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে সনদ লাভ করেন। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং তদপরবর্তীতে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে সনদ লাভ করেন। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ ১৯৫৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে তার বেশির ভাগেরই আইনজীবী ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। মার্শাল ল'র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোয় ১৯৮২ সালের ১০ অক্টোবর তাকে তৎকালীন সরকার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে আমৃত্যু বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং জেল হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের চিফ স্পেশাল প্রসিকিউটর ছিলেন। ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন সিরাজুল হক। তাকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে বেগম জাহানারা হকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সিরাজুল হক। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বর্তমান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক তার বড় ছেলে। ছোট ছেলে মরহুম আরিফুল হক রনি ও মেয়ে মরহুমা সায়মা ইসলাম। সিরাজুল হকের সহধর্মিণী বীর মুক্তিযোদ্ধা বেগম জাহানারা হক ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।  তাকেও বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত