বেসরকারি নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে এক শিক্ষকের মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার দুপুর একটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এতে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধন চলাকালে কোনরূপ প্রমাণ ছাড়াই একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে মারধরের প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা।
একইসঙ্গে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানান তারা।
পরিসংখ্যান বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তানভির আহমেদ পিয়াস বলেন, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ দিয়ে তাকে মারধর করা হয়েছে। ফেসবুকে ওই শিক্ষকের ছবিসহ পোস্ট করে তাকে অপমানিত করা হয়েছে। এভাবে নর্থ-সাউথের শিক্ষার্থীরা পুরো শিক্ষক জাতিকে অপমান করেছে। এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা ছিল এবং স্পষ্ট যে, এটি একটা সাজানো নাটক। আমরা শিক্ষককে হেনস্তা ও মারধরের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। বিচার না পেলে আমরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করব।’
৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাসলিমা বলেন, ‘পুরো ঘটনা সবার সামনে নিয়ে আসা হোক। আর এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। কোনো তথ্য ছাড়াই তারা ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ দিয়ে একটা নাটক সাজিয়ে পোস্ট দিল। শিক্ষক দোষী হলেও তার গায়ে হাত তোলার অধিকার কোনো শিক্ষার্থীর নেই। যে শিক্ষককে মিথ্যা অভিযোগে হেনস্তা করা হলো তিনি এর আগে সুনামের সাথে আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। আমাদের বিশ্বাস তিনি এ ধরনের ঘটনায় জড়িত না।’
এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আতিকুর রহমানকে কফিশপে ডেকে দলবদ্ধ হয়ে পিটুনির অভিযোগ উঠে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।
গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়।
ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই শিক্ষককে বেধড়ক মারধর ও হুমকি দিচ্ছেন কয়েকজন তরুণ। মারধরের শিকার আতিকুর রহমান নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।
ফেসবুকে ভিডিওটি ছড়ানো নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একজন অরিন্দম বর্ধন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গণিত বুঝতে আতিকুরের কাছে গেলে তিনি মেয়েটিকে জাবিতে গিয়ে শিখে আসতে বলেন। তারপর থেকে আতিকুর ওই মেয়েকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন। বিভিন্ন সময় দেখা করার প্রস্তাব দিতে থাকেন। এক সময় ওই ছাত্রীকে আইফোনসহ বিভিন্ন দামি উপহার দেয়ার প্রস্তাব দেন আতিকুর। পরে ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে অভিযুক্ত আতিকুরকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অ্যারাবিকা কফিশপে দেখা করতে বলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আতিকুর ক্যাফেতে গেলে সেখানে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে। এ সময় তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তাকে ধাওয়া দিয়ে ধরে ফেলে।’
ওই শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীরা আতিকুর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তবে ছাত্রীকে হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আতিকুর রহমান।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ওই ছাত্রী আমাকে বিভিন্ন সময়ে ফোন দিয়ে বিরক্ত করতো। তার অ্যাকাডেমিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসে। কয়েকবার সমাধানও করে দিই। এরপর সে আমাকে রিভিউ ক্লাস নিতে বলে। কিন্তু আমি বলি, রিভিউ ক্লাস নেওয়া শেষ হয়ে গেছে। তারপরও সে আমাকে ফোন করতে থাকে, তাকে পড়ানোর জন্য। আমি তাকে জানিয়ে দিই, পরীক্ষার আগ পর্যন্ত আমি আর নর্থ সাউথে যাব না। আমি জাহাঙ্গীরনগর থাকব।
তিনি আরও বলেন, ‘তারপরও সে আমাকে বারবার কল দিতে থাকে। বারবার অনুরোধের কারণে অবশেষে তাকে পড়াতে রাজি হই এবং নর্থ সাউথে আমার অফিসকক্ষে আসতে বলি। কিন্তু সে আমাকে বলে, অফিসে অনেক ফ্যাকাল্টি মেম্বার থাকে, আপনি অ্যারাবিকা কফি হাউসে আসেন।’
এই শিক্ষক জানান, অ্যারাবিকা কফি হাউসে কিছুক্ষণ বসার পর মেয়েটি কয়েক যুবককে সঙ্গে নিয়ে আসেন। ওই যুবকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে মারতে শুরু করেন। ‘একপর্যায়ে তাকে কফিশপ থেকে বের করে এনে আরও ছয়-সাতজন মিলে মারধর শুরু করেন। তারা আমার কোনো কথাই শুনছিল না। ফলে আমি দৌড় দেই। তারা আমাকে দৌড়ে ধরে ফেলে এবং বিভিন্ন হুমকি দিতে থাকে। আমার মানিব্যাগ বের করে সব টাকা নিয়ে যায়। একপর্যায়ে ডেবিট কার্ডের পিন নম্বরও চায়। মারধরের পর তাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে যাওয়ার সময় যুবকদের একজন তার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে প্রক্টর অফিসে গেলে ওই ছাত্রী তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। আর প্রক্টর অফিস থেকে মারধরের বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।’
তবে এ বিষয়ে জানতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
