ইমরান খান ইতিমধ্যেই ক্ষমতায় ফেরার যে পরিকল্পনা করে রেখেছেন

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২২, ১০:২৯ পিএম

গত সপ্তাহের শেষে পাকিস্তানিরা এমন কিছু দেখেছে যা তারা কখনো দেখবে বলে ভাবেনি; সেটি হলো তাদের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কান্নায়। তিনি টিভিতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন যখন সুপ্রিম কোর্ট তাকে জাতীয় পরিষদে ফেরত পাঠাল শাহবাজ শরিফের আস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

এর আগে তিনি আস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে বিধানসভা ভেঙে দিয়েছিলেন, কিন্তু আদালত তার পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করে। খান জাতীয় পরিষদের নিয়ম না মানার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ও এড়াতে চেষ্টা করেন এবং আদালতের বেঁধে দেওয়া মধ্যরাতের সময়সীমার মাত্র কয়েক মিনিট আগে রণেভঙ্গ দেন করেন। তিনি একটি সাধারণ সংসদীয় পদ্ধতিকে একটি স্নায়ুক্ষয়ী থ্রিলারে পরিণত করেন। তিনি এমন এক শিশুর মতো আচরণ করেন যে প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে অন্য শিশুদেরও জন্মদিন রয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন, তিনি যদি দায়িত্বে না থাকেন তবে সেই বাড়ি পুড়িয়ে ফেলতে পারবেন।

জাতির উদ্দেশে ৮ এপ্রিলের দেওয়া ভাষণে খান তার দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে বহিষ্কার করতে চায়। তিনি জনগণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তারা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে থাকতে চায় না যুক্তরাষ্ট্রের দাস হতে চায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো ভারতের সঙ্গে এমন করবে না। এখানে তিনি আবেগী হয়ে গেলেন করে, তার নিশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেল।

একজন ক্রিকেটার হিসেবে খান সব সময় তার আবেগ দেখাতে লজ্জা পেতেন। এমনকি গৌরবের মুহূর্তে, তিনি অনুচ্চ হাই-ফাইভ এবং অনিচ্ছুক আলিঙ্গন করতেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি আবেগ দেখাতে শিখেছেন। আর তিনি খুব রেগেও গেলেন। ৭০ এর কাছাকাছি এসে, তিনি সেই রাগান্বিত যুবকে রূপান্তরিত হন যিনি আবেগের সঙ্গে একের পর এক বিপরীত কথা বলতে থাকেন।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খান পাকিস্তানের রাজনীতিতে একজন বহিরাগত ছিলেন। পাকিস্তানি ভোটারদের চেয়ে লন্ডনের আলিশান পরিবেশে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি একজন ক্রীড়া তারকা যিনি একটি দেশের ত্রাণকর্তা হতে চেয়েছিলেন। স্বপ্নের আসনটি পাওয়ার জন্য তিনি তার আদর্শ থেকে সরে আসেন। ক্ষমতায় আসার আগে তিনি বলেছিলেন ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে যাওয়ার চেয়ে তিনি মারা যাবেন;

যদিও কয়েক মাস পর তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে ভিক্ষা করতে যান। তিনি এমন রাজনীতিবিদদের দ্বারা ঘেরাও হয়েছিলেন যাদের তিনি পাকিস্তানের সমস্যার মূল কারণ বলে দাবি করেছিলেন ।

প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইমরান খান দেশের কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এর পরিবর্তে একটি নৈতিক ধর্মযুদ্ধে নেমেছিলেন; কারণ তার যৌবনে তিনি পশ্চিমে যে পাপের জীবন যাপন করেছিলেন পরে কেবল তার প্রায়শ্চিত্তই করতে চাননি বরং জাতির একজন আধ্যাত্মিক পিতা হতে চেয়েছিলেন। নিজের চিন্তায় তিনি কেবল পাকিস্তানের নেতা ছিলেন না, বিশ্ব উম্মাহর (মুসলিম সম্প্রদায়ের) নেতা হিসেবেও নিজেকে ভাবতেন। গত মাসে তিনি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, কীভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির জন্য পর্নোগ্রাফি দায়ী। যদিও তিনি নিজেই তিনটি বিয়ে করেছেন।

বিরোধী দলে থাকাকালীন তিনি পাকিস্তানে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির তোষণকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তাকে অস্থির এবং বিভ্রান্ত মনে হচ্ছিল, যেন তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। চোর-লুটেরাদের সঙ্গে বসবেন না বলে তিনি খুব কমই সংসদে আসতেন।

অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়ে খান সেনাবাহিনী তাকে উদ্ধারে আসবে এ জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন, সেনাবাহিনী তার উত্থান উদ্‌যাপন করেছিল এবং তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে একটি বদ্ধমূল অনুভূতি ছিল যে তারা 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে' যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা দ্বারা ব্যবহৃত এবং পরিত্যক্ত হয়েছিল। খানের মধ্যে তারা এমন একজন ব্যক্তিকে দেখেছিল যে নিজের স্বার্থ রক্ষা করে পশ্চিমের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।

কিন্তু এটা স্থায়ী হয়নি। ইমরান খানের পতন এ জন্য হয়নি যে তিনি কিছু করতে পারেননি, সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের পতন হয়েছিলে। খান যখন তার নিজের লোককে ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন সেটা বিশাল অপরাধ হয়ে দেখা দিল। যে কোনো বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীতে হস্তক্ষেপ করলে বা দেশের প্রতিরক্ষা নীতি চালাতে গেলে তাকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়। সেনাবাহিনী তার সমর্থন প্রত্যাহার করার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলগুলি তার পতনের  জন্য এগিয়ে আসে।

খান কেন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করছেন না? তার শিশুসুলভ বাহ্যিক আচরণের পেছনে, একজন বাস্তববাদী ব্যক্তি রয়েছে। তার দলের নেতারা তাকে পরিত্যাগ করার জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছে, কিন্তু খান নিজে এ সেতুটি পুড়িয়ে দিতে চান না যা তাকে আবার একদিন অফিসে ফিরিয়ে আনতে পারে।

ইমরান খান ক্ষমতায় আসেন ভোটারদের এটা বুঝিয়ে যে যে তিনিই চারপাশে একমাত্র পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, বাকি সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। এখন তার বিরোধিতাকারী সবাই শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত নয়, দেশদ্রোহী এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল। খান অফিসে কখনই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি এবং এখন তাকে রাস্তায় ফেরত পাঠানো হয়েছে যেখানে তিনি আবার দেশকে বাঁচাতে তার ক্রুসেড শুরু করতে পারেন।

মোহাম্মদ হানিফ: পাকিস্তনি ঔপন্যাসিক।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত