বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার কী

আপডেট : ০৪ জুন ২০২২, ১০:৫৩ পিএম

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও বিশ^ পরিবেশ দিবস পালন করা হয় এবং এ বছরের পরিবেশ দিবস বিশেষ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। এই জন্য যে, ২০২২ সাল পরিবেশ দিবস উদযাপনের ৫০ বছর। শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে। শুরুর মতো এবারের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘একটাই পৃথিবী’ (ঙহষু ঙহব ঊধৎঃয)। এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীতে পরিবেশ ধ্বংস বেড়েছে বৈ কমেনি। ক্রমাগত জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও বিভিন্ন ধরনের দূষণের কারণে পৃথিবী এখন এমন ঝুঁকির মধ্যে আছে যা সত্যিই নজিরবিহীন।

বাংলাদেশের জন্য পরিবেশ দিবস খুবই প্রাসঙ্গিক। আমরা একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভুক্তভোগী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণের কোনো কোনো ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়নও বটে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা নগণ্য হলেও পরিবেশ ধ্বংস ও দূষণের ক্ষেত্রে একেবারে প্রথম কাতারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের অমাদের ভূমিকা কম বলে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই, বরঞ্চ যা আছে তা হলো পরিবেশ সংরক্ষণে যথাযথ ভূমিকা নেওয়ার দায়িত্ব।

এই দায়িত্ব অবহেলার কারণেই ঢাকার বাতাস পৃথিবীর অন্যতম দূষিত, ঢাকা ও আশপাশে যতগুলো জলাভূমি আছে তার প্রায় সবগুলোই চূড়ান্ত মাত্রায় দূষিত, খাল ও নদী যেন ময়লার ভাগাড়, নর্দমা ও শিল্প বর্জ্যরে নিরাপদ ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’। পাহাড় কাটা, নদী, খাল ও জলাভূমি ভরাট, বনভূমি ধ্বংস ইত্যাদি তো আমাদের প্রেক্ষাপটে প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা। পাশাপাশি ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শহুরে জীবনে যথেচ্ছাচার শব্দযন্ত্রের ব্যবহার, অপরিকল্পিত দালানকোঠা ও অবকাঠামো পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনছে।

যদিও পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের আইন ও বিধিবিধানের বহরটা একেবারে কম না, রয়েছে একগুচ্ছ বিধিবিধান যেমন জাতীয় পরিবেশ নীতি (২০১৮), পরিবেশ আদালত আইন (২০১০), বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন (২০১৭), পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা (২০১৬), কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা (২০২১), শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা (২০০৬) ইত্যাদিসহ আরও অনেক। এত এত আইন ও বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও আমাদের পরিবেশ কীভাবে দূষণের শিকার হচ্ছে তা সহজে বোধগম্য নয়!

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়েছে সদ্যই, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করলেও পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের ভূমিকা যেন বিস্মৃতি প্রবণতায় পরিপূর্ণ। একইভাবে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসও পঞ্চাশতম বছর উদযাপন করছে। পরিবেশ সুরক্ষাকে সামনে রেখে ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের এক সম্মেলনে ৫ জুন-কে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এই দীর্ঘ পঞ্চশ বছরে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্রসমূহ কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। পরিবেশবাদীরা বলছেন, বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। গড় তাপামাত্রা বাড়ার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিসমূহ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই পঞ্চাশ বছরে হয়তো পৃথিবীতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, অনেক শিশুর শিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবার বেশ কিছুটা উন্নতি হয়েছে কিন্তু সমানতালে বিশ্বব্যাপী অসমতা বেড়েছে আর এর পেছেনে মূল ভূমিকা রেখেছে কিছু মানুষের স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছাচার ব্যবহার।

পরিবেশ দূষণের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সংযোগ সরাসরি। পরিবেশ দূষণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন যেমন ত্বরান্বিত হয় তেমনি পরিবেশ দূষণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আরও মারাত্মক রূপ লাভ করে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী মানুষ এবং প্রাণ-প্রকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বিশ্ব নেতৃবৃন্দ পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী সময় থেকে ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় প্রাকৃতিক পরিবেশের যথাযথ সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। যদিও উন্নয়নের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্পর্ক কী হবে এ আলোচনা দীর্ঘদিনের। ১৯৯২ সালের ব্রাজিলের রিও শহরের নাম অনুযায়ী পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্পর্কিত ঘোষণায় উন্নয়নের অধিকারের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই ঘোষণায় বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদাসমূহ বিবেচনায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের সংরক্ষণ।

জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিবেশ দিবসের আয়োজন ১৯৮৭ সাল থেকে এক এক বছর এক এক দেশে উদযাপিত হয়ে আসছে। এবারের পরিবেশ দিবসের স্বাগতিক দেশ হচ্ছে সেই পঞ্চাশ বছর আগের মতো সুইডেন। ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে সুইডেনের স্টকহোমে যে সম্মলনের আয়োজন করা হয় তার ঘোষণায় পরিবেশ নিয়ে শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বায়ু ও পানিদূষণ, সমুদ্র দূষণ ও পৃথিবীর মানুষের কল্যাণ ইত্যাদি বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। পাশাপাশি এই সম্মেলনে যে কর্মপরিকল্পনা করা হয় তাতে পরিবেশ সংরক্ষণে বৈশ্বিক পরিবেশের পর্যালোচনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়। এর পরবর্তী সময়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস আয়োজনে বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা (২০২১), প্রকৃতির সংরক্ষণ (২০২০), বায়ুদূষণ বন্ধ করা (২০১৯), প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করা (২০১৮) এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সংযোগ (২০১৭) ইত্যাদি পরিবেশ সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জসমূহ আমাদের সামনে স্পষ্ট করে।

উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ধ্বংস নিঃসন্দেহে একটি সেকেলে ধারণা। এই ধারণা কেবল বিশেষ গোষ্ঠী ও শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণে সর্বসাধারণের সচেতনতা যেমন প্রয়োজনীয় একইসঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের সক্রিয়তা ও আইনের যথাযথ ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রয়োজনীয় যোগ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণ করছি।

অন্যদিকে প্রকৃতিকে শোষণ করে বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের প্রবৃত্তি যেন আমাদের কারও কারও কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়। পাশাপাশি আবার বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই পরিবেশের জন্য সহায়ক না। অনেক আগে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পলিথিন ছাড়া যেন কোনো কিছুই চলছে না! রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানগুলোতে যেভাবে থরে থরে চিপস এর রঙিন প্যাকেট লোভনীয়ভাবে সাজানো থাকে তা যেমন সহজেই দৃষ্টি অর্কষণ করতে পারে একইসঙ্গে সচেতনতার অভাবে এর একটা বড় অংশই রাস্তাতেই নিক্ষিপ্ত হয়।

এখন সময় এসেছে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে পরিবেশ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এজন্য আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মকে এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা খুবই প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধির যেমন বিকল্প নেই একই সঙ্গে যারা পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী, পরিবেশ দূষণের মাধ্যম মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত তাদের কাছ থেকে যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা আবশ্যক। এভাবে সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলেই পরিবেশ দিবসের আসল উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত