কাজী সালাউদ্দিন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান তিনি। দেশের ফুটবল ভালোমন্দ অনেকাংশেই নির্ভর করে তার ওপর। জাতীয় দলের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর কাছে কিংবদন্তি এই ফুটবলার বলেছেন অনেক কিছুই। যার চৌম্বক অংশ দিয়ে সাজানো এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার
এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে কেমন মনে হলো জাতীয় দলকে?
সালাউদ্দিন : অনুভূতিটা ভালোমন্দ মিলিয়ে। শুরুটা দল ভালোভাবেই করেছিল। শেষটা নিখুঁত হয়নি। তবে সত্যি বলতে কী, আমি আগেই বুঝেছিলাম দল সেভাবে ভালো করতে পারবে না। যখন দেখলাম বসুন্ধরা কিংস এএফসি কাপে ভালো করল না, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল যে জাতীয় দলে এই ছেলেরা ভালো করতে পারবে না। বাস্তবতা হচ্ছে, জাতীয় দলের কাছে ফুটবলাররা থাকে বড়জোর পাঁচ দিন। যদি এএফসি কাপে ওরা ভালো করতে না পারে, তাহলে জাতীয় দলে কীভাবে ভালো করবে? ফুটবল হচ্ছে ক্লাবের খেলা। ক্লাব তো আমাকে যখন তখন খেলোয়াড় ছাড়বে না। খেলোয়াড় ইচ্ছেমতো ছাড়ার অধিকার তাদের আছে। তাই যতদিন পর্যন্ত ক্লাবগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করবে না, ততদিন পর্যন্ত জাতীয় দলের ফল ভালো হবে না। এটাই স্বাভাবিক।
ফুটবলাররা তো বল পায়েই রাখতে পারছে না...
সালাউদ্দিন : ক্লাবের ট্রেনিংটাই হচ্ছে মূল ট্রেনিং। একজন ফুটবলার সেখান থেকেই প্রস্তুত হয়ে জাতীয় দলে আসে। জাতীয় দলে আসার পর কোচ শুধু ফরম্যাশন নিয়ে কাজ করার সুযোগ পায়, এর বেশি কিছু করার নেই তার। শেষ খেলায় বড় সমস্যা দেখেছি বল রিসিভিংয়ে। বল আয়ত্তে রাখতে পারছে না। পাসটা ঠিকঠাক হচ্ছে না। হয় ধীরে হচ্ছে, নয়তো জোরে হয়ে যাচ্ছে। যে বলটা ডিফেন্স থেকে ক্লিয়ার করছে, সেটা দূরে না গিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে, ফলে ডিফেন্সের ভুল হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। তখন সেটা যে কারও বল হয়ে যাচ্ছে। এই ভুলগুলো শোধরানোর কাজটা তারা শিখে আসবে ক্লাব থেকে।
ক্লাবগুলো তো এখন ভালো কোচের দিকে ঝুঁকছে?
সালাউদ্দিন : সত্যি বলতে আমাদের দেশের ক্লাবগুলোর দুয়েকটা ছাড়া শুধু খেলার জন্য খেলে। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই তাদের। গভীরতা নেই তাদের খেলায়। আপনি যখন যুদ্ধ করবেন, যাদের সঙ্গে খেলবেন, তারা তো অনেক এগিয়ে গেছে। সমান্তরালে আমরা পারিনি এগোতে। আমাদের এখানে সমালোচকের অভাব নেই। তারা সোশ্যাল মিডিয়া গরম করছে। মালয়েশিয়া ম্যাচটা প্রায় ৬০ হাজার দর্শক দেখেছে। সে দেশের মানুষ খেলা দেখতে মাঠে যায়। আর আমাদের এখানে মাঠে যাওয়ার চেয়ে সরব সোশ্যাল মিডিয়ায়। সবাই এক্সপার্ট। যেকোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করে ফেলে না বুঝে।
গত দুই দশকে নিশ্চয় আমাদের মানও নেমেছে অনেকটা?
সালাউদ্দিন : আমি একমত নই। আমাদের সময় বা আমাদের আগে, পরেও মিডিয়া খেলা অত ফলাও করে প্রচার করত না। আমরাও কিন্তু ১০-১২টা করে গোল খেতাম।
অথচ সে সময় তো একজন ফুটবলারের খেলা দেখতেই গ্যালারি ভরে যেত। আপনার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখতে ৩০-৪০ হাজার দর্শক জড়ো হতো। এটা চিন্তা করলে নিশ্চয় মেনে নেবেন সামগ্রিক মানে নিচে নেমেছে?
সালাউদ্দিন : আমি মানব না। ১৯৯২-৯৩ থেকে ২০০৬-২০০৭ এর মধ্যে আমাদের খেলাধুলার সংস্কৃতিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েদের ফোকাসটাই সরে গেছে অন্যদিকে। আজকালকার ফুটবল হচ্ছে মোর দ্যান টিম ফুটবল। আপনি বিশ্বজুড়ে ৪-৫ জন তারকার নাম জানবেন। বাকিরা কিন্তু সমপর্যায়ের ফুটবল খেলছে। ম্যানচেস্টার সিটিতে কজন তারকা আছে? অথচ বিশ্বের অন্যতম সেরা দল তারা। ফুটবল আসলে বদলে গেছে। এখন আর এক-দুজন তারকার পেছনে মানুষ ছোটে না। এখন সবাই এগিয়ে গেছে ক্লাব ফুটবলকে প্রাধান্য দিয়ে। একটা সময় আমরা কাতারকে হারিয়েছি। তারা উন্নতি করতে করতে বিশ্বকাপে পৌঁছে গেছে। আমরাই সেভাবে এগোতে পারিনি। তবে আমি বলব আমাদের তুলনায় এখনকার ফুটবলাররা কোনো অংশেই খারাপ না।
আপনার মুখে এ সময়ের ফুটবলারদের নিয়ে কখনই খারাপ কিছু শুনিনি। উল্টো তাদের রক্ষা করেন সবসময়...
সালাউদ্দিন : আমি সত্যিটা বলি। আপনি অতীত নিয়ে যতই লাফালাফি করেন, আমি সত্যিটা বলবই। তা ছাড়া আমার সামনে তো আর কোনো পথও খোলা নেই। যারা আছে, তাদের ওপরই আমাকে নির্ভর করতে হবে। আবারও বলছি ক্লাবগুলো যতদিন না পেশাদারি পথে হেঁটে উন্নতি করবে, আমাদের ধুঁকতেই হবে।
এই বাস্তবতায় উন্নতি করাও তো কঠিন?
সালাউদ্দিন : আমি যদি ছয় মাস, এক বছর, দুবছর টানা খেলোয়াড়দের পেতাম, অবশ্যই আপনাকে একটা অসাধারণ দল গড়ে দিতে পারতাম। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়। সেই সুযোগ তো আমাকে কখনই দেবেন না। তাই ক্লাবগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।
অনেকেই বলেন, ফরোয়ার্ডলাইন ও রক্ষণে বিদেশিদের আধিপত্যের কারণে স্থানীয়রা খেলার যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে না বলেই উন্নতি হচ্ছে না?
সালাউদ্দিন : এটা কারা বলে? যারা বলে তারা অপেশাদার লোক। তারা ফুটবলই বোঝে না। স্পেন যখন বিশ্বকাপ জিতল, ব্যাক টু ব্যাক তারা ইউরোর শিরোপাও জিতেছিল। স্পেনের দুটি বড় ক্লাব বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের স্ট্রাইকিং পজিশনে কারা খেলেছে? বার্সেলোনায় তখন ছিল মেসি ও সুয়ারেজ। আর রিয়ালের ছিল রোনালদো ও করিম বেনজেমা। এরা সবাই অন্য দেশের। বাকিদের নিয়েই কিন্তু স্পেন বিশ্বসেরা হয়েছিল। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলেই এটা প্রচলিত। যত বেশি বিদেশিদের সঙ্গে খেলবে ততই স্থানীয়রা শিখতে পারবে। তারা শিখবে কী করে বিদেশিদের আটকানো যায়। তাদের বিপক্ষে গোল করা যায়।
অনেক দিন সাফল্য না পাওয়ায় একটা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিও নিশ্চয় আছে?
সালাউদ্দিন : সেটা তো একটু থাকবেই। যত বেশি খেলবে, তত নিয়ন্ত্রণে আসবে খেলা। আগের চেয়ে আমি মনে করি খেলায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ এসেছে। আর লড়াকু মনোভাব গড়ে তোলার চর্চাটা ক্লাব পর্যায় থেকে করতে হবে।
স্থানীয় স্ট্রাইকাররা যখন পারছে না তখন এলিটা কিংসলেকে তো ঝালিয়ে দেখতে পারেন?
সালাউদ্দিন : কোচ আসলে খুব বেশি আগ্রহী নয় ওর ব্যাপারে। তার কথা হলো, এলিটা ওই মানের স্ট্রাইকার না যে, ম্যাচের গতি প্রকৃতি পাল্টে দেবে। যারা আছে তাদের সঙ্গে খুব বেশি তফাৎ নেই।
মালয়েশিয়া বেশ কজন ভিনদেশিকে নাগরিকত্ব দিয়ে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আপনাদের ওরকম কোনো ভবিষ্যৎ ভাবনা আছে কী?
সালাউদ্দিন : চিন্তা তো অনেকবারই করেছি। এর মধ্যে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুটি দিকই আছে। এই চেষ্টা শুরু করলে তখন আপনারাই আমার সমালোচনা শুরু করে দেবেন। এটা আমাদের জাতিগত সমস্যা।
তারপরও তো আপনার হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই...
সালাউদ্দিন : আমি তো কাজ করতেই থাকব। দেখা যাক কী হয়। কিছু পরিকল্পনা করেছি। এ বছরই হয়তো দেখতে পাবেন কিছু পরিবর্তন। আমার একটা কষ্টের কথা বলি। দুমাস ট্রেনিং করিয়ে আমাদের এলিট অ্যাকাডেমি দলকে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলতে পাঠিয়েছি। প্রথম খেলাটা দেখতে গেলাম। ধরেই নিয়েছিলাম ৪-৫ গোল হারবে। সব তো বাচ্চা ছেলে। অথচ দেখলাম দল জিতল। সবাই তো খুব খুশি। আমি খুব দুঃখ পেলাম। কারণ হলো, এই বাচ্চারা ২ মাস অনুশীলন করে যদি জিততে পারে, তার মানে তো দেশে খেলোয়াড়ই নেই। এ থেকেই বোঝা যায় ক্লাবগুলোর দৈন্য। এ থেকে বেরিয়ে না এলে কোনো কিছু করেই লাভ নেই।
