সিলেট-সুনামগঞ্জে পানি কমছে, বৃহস্পতিবার থেকে ওসমানী বিমানবন্দর চালু

আপডেট : ২৩ জুন ২০২২, ১২:১৭ এএম

উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। পানি নামতে শুরু করায় শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত এই দুই জেলার মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসছে।

তবে দুর্ভোগ-যন্ত্রণা দূর হয়নি। বিশুদ্ধ পানি ও ত্রাণের সংকট আছে। যদিও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ শুরুর তুলনায় গত দুই-তিন ধরে অনেকটা বেড়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের লোকজন- যেসব এলাকায় একেবারেই ত্রাণ পৌঁছেনি, সেসব এলাকায় ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন। এতে প্রাণরক্ষা হচ্ছে অনাহারী মানুষের।

তবু বন্যায় সর্বস্ব হারানো মানুষ এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। কারণ এ বছর এখন পর্যন্ত ৩ দফার বন্যায় তারা প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন। প্রথম দফার বন্যায় গেছে খেতের বোরো ফসল, দ্বিতীয় দফার বন্যায় আউশ-আমনের বীজতলাসহ নানা জাতের ফসলহানি ঘটেছে। আর চলমান ভয়াবহ বন্যায় ঘরের ধান-চাল, আসবাবপত্র, গবাদিপশু, চাষের মাছ ভেসে গেছে। অনেকের কাঁচা বাড়িও বানের পানিতে বিলীন। পানি কমার পর তাদেরকে ফিরতে হবে শূন্য ভিটায়।

ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন, জনপ্রতিনিধি সবাই বলছেন, ভয়াবহ এই বন্যা মানুষকে যেভাবে নিঃস্ব করেছে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অনেক কঠিন। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিপুল সহায়তা প্রয়োজন। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে সিলেটে মতবিনিময়সভায় বলেছেন, পানি কমার পর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার সব রকম সহায়তা দেবে। এটা মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে।

এদিকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে পানি নেমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে এই বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা আবার শুরু হবে। গত শুক্রবার থেকে এই বিমানবন্দর বন্ধ ছিল।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজ আহমদ বলেন, রানওয়ে ও অ্যাপ্রোচ এলাকার পানি নেমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে প্রথমে পরীক্ষামূলক একটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। এটি সফল হলে বিমানবন্দর পুরোদমে সচল হবে।

সিলেট বিভাগীয় প্রশাসনসূত্র জানায়,  সিলেট ও সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কোথায়ও উন্নতি, আবার কোথায়ও অবনতি হয়েছে। সুরমার পানি কমায় সিলেট নগরের পানি কমছে। তবে কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে দক্ষিণ সিলেটের মোগলাবাজার, দক্ষিণসুরমা, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণসুরমা উপজেলার মোগলাবাজারের নৈখাই কতুবপুর গ্রামের মানুষজন বাড়িতে পানি ঢোকায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন। পুরো গ্রামে ১৪০ ঘর রয়েছে, এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সবার ঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। এই গ্রামের আশপাশের রাঘবপুর, গোপালগাঁও, হরঘরি, মির্জাপুরসহ আরও কয়েকটি গ্রামে গত মঙ্গলবার রাত থেকে পানি বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

সিলেট নগরের সোবহানীঘাট, যতরপুর, উপশহর, মেন্দিবাগ, সাদাটিকর, তেররতন, মাছিমপুর, ছড়ারপাড়, কালীঘাট, তালতলা, জামতলা, মাছুদিঘীরপাড়, লামাপাড়, বেতেরবাজার, ঘাসিটুলা, বাগবাড়ি, শেখঘাট, কাজিরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি কমতে দেখা গেছে। তবে এসব এলাকার তুলনামূলক নিচুতে থাকা বাসা-বাড়ি, দোকান, সড়কে এখনো পানি।

এছাড়া সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, সিলেট সদর, বিশ্বনাথ বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় এখনো বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কুশিয়ারা ও সারি নদীর পানি দুইটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে। অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরে সিটি করপোরেশন ৮৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোতে প্রায় ৭ হাজার বন্যাকবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে অনেকে এখন বাসা-বাড়িতে ফিরে গেছেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, নগরীতে বন্যাদুর্গত মানুষদের আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তায় সিটি করপোরেশন সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ পাওয়া চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে আরও অনেক বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। আশা করছি পরিস্থিতির আরও দ্রুত উন্নতি হবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন দুর্গতদের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে সুনামগঞ্জে বন্যার পানি আরও কমছে, তবে বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। দেখা দিচ্ছে ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ পানিবাহিত নানা রোগ।

সুনামগঞ্জের কিছু এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট থেকে পানি নামছে। তবে শহরের অনেক রাস্তাঘাট, বাড়িঘরে এখনো পানি রয়েছে। পানি কমার সাথে সাথে শহরের পাড়ামহল্লায়, রাস্তাঘাটে ভেসে উঠছে ময়লা-আবর্জনা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। এর মধ্যে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটে ব্যথা, জ্বরসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ।

সেনাবাহিনীর একটি টিম সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে দুর্গত মানুষকে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়েছে। চিকিৎসা দলে থাকা ক্যাপ্টেন কাজী তানজিদুর রহমান জানান, ‘মানুষ পানিবাহিত রোগ নিয়েই বেশি আসছেন। এছাড়া চর্মরোগও আছে। তারা সবাইকে প্রয়োজনীয় সেবা ও ওষুধ দিচ্ছেন’।

সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যে সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী জেলায় প্রায় ৫০০ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত