টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার এই মুহূর্তে চাপে রয়েছে এমন আলোচনা সর্বত্র। বিএনপিসহ দেশের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো অব্যাহতভাবে বলেই যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার চাপে রয়েছে। এ কথা বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও। বিশেষত ভারতীয় গণমাধ্যম বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও নিবন্ধ প্রকাশ করছে। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী নানা মহলের এ প্রচার-প্রচারণাকে আমলে না নিয়ে সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, সরকার চাপে আছে রটিয়ে দিয়ে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মনোবলে আঘাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের চাপে পড়া শুরু হয় মূলত গত ডিসেম্বরে মানবাধিকার ইস্যুতে র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর। এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কূটনৈতিক পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও এখন পর্যন্ত সুফল আসেনি। এরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। ডলারের বাজারেও শুরু হয় অস্থিরতা, যা এখনো পর্যন্ত কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এর মধ্যে জ্বালানির নিশ্চয়তা নিয়ে আরেক দফা বিপাকে পড়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ রেশনিংয়ের কথা ভাবছে সরকার। এরই মধ্যে রাজধানীতেও লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
৪৪.৪২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে কমতে গত ১২ জুলাই ৩৯.৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে গেছে। বলা হচ্ছে, এ রিজার্ভ দিয়ে মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। এছাড়া ২০২৪ সাল থেকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। সব মিলিয়ে সরকার বড় ধরনের চাপে রয়েছে বলে দেশে-বিদেশে আলোচনা আছে।
এছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে রয়েছে সরকার। বিরোধী দলগুলো বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে আস্থায় নিতে পারছে না। তারা এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে সরকার এখন থেকেই ভাবতে শুরু করেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেফাঁস কথা বলার রাজনীতি বাংলাদেশে অনাদিকাল ধরেই চলে আসছে। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বলার রাজনীতি চলছে, চলুক। আমরা এগুলো আমলে না নিয়ে আমাদের কাজ করছি।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দাবি করছে, দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে উঠছে। তাদের দাবি, নড়বড়ে হয়ে ওঠার গতি অনেকটাই ধীর, তবে অবিলম্বে মোকাবিলা করা না হলে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসবে। সরকার চাপে আছে এ ধরনের আলোচনা আমলে না নিয়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা বলছেন, সরকারবিরোধী শক্তি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রটনা রটিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমস বাংলাদেশ নিয়ে এক নিবন্ধে সরকার প্রবল চাপের মধ্যে আছে বলে দাবি করে। ওই নিবন্ধের শিরোনাম করা হয় শেখ হাসিনার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। এই নিবন্ধ নিয়ে জানতে চাইলে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মিডিয়ার লেখা আমি পড়ি না। আমি মনে করি এগুলো আমলে নেওয়ারও কিছু নাই।’ তিনি বলেন, ‘দেশীয় মিডিয়ায় কিছু বললে সেটা নিয়ে ভাবার আছে। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার লেখালেখিতে সরকারবিরোধী মহল আরও চাঙ্গা হয়। তারা মনে করে সরকার বুঝি ক্ষমতাচ্যুত হয়েই গেল। অবশ্য বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল গত এক যুগ ধরেই স্বপ্ন দেখে আসছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পড়েই যাচ্ছে। কিন্তু জনগণ সেটা বিশ্বাস করে না, আমলেও নেয় না। জনগণের ভেতরে এই সরকারের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস সবই রয়েছে বলেই আমরা ক্ষমতায় আছি।’
সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের চাপে পড়ার আলোচনা সত্য নয়, গুজব। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ও দেশের মানুষের মনোবলে চিড় ধরাতে পরিকল্পিতভাবে এ গুজব ছড়ানো হচ্ছে। জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রচার সত্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি, কাজ করে যাচ্ছি।’
আওয়ামী লীগের দুজন মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, পরিস্থিতি নাজুক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ কথার কোনো সত্যতা নেই। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা দুর্বল ভিত্তির ওপর রয়েছে বলেও যে দাবি করা হচ্ছে তারও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার চাপে রয়েছে এ আলোচনা প্রকৃত অর্থেই গুজব। দেশের জনগণের ভেতরে ও দলের নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে চায় বলেই পরিকল্পনা অনুযায়ী গুজব ছড়ানো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ এগুলো।’
নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি বিদেশিদের কাছে ধরনা দিচ্ছে বলে দাবি করেছেন সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা বিদেশি শক্তি যত বড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।
কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি নিয়ে যে অপপ্রচার চলছে তা বিএনপি সুকৌশলে রটাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি বিদেশি বা উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছে। তাদের অনেক কিছু মিথ্যাভাবে তুলে ধরছে। এগুলোর প্রতিফলন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে জনগণের কাছেই যেতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বা বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের নির্বাচনের তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।’
সম্প্রতি সচিবালয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াটলি বৈঠক করেন। এরপর সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিএনপির বৈঠকের বিষয়টি হোয়াটলির সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে। জাতীয় নির্বাচনসহ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ আহ্বান করা দেশের জন্য কল্যাণ ডেকে আনবে না বলে মন্তব্য করেন তাজুল ইসলাম। যেসব দেশ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দিয়েছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে আওয়ামী লীগের অন্য সভাপতিম-লীর সদস্য শাজাহান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়ে প্রমাণ করেছে জনগণের প্রতি তাদের বিশ্বাস নেই এবং জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখে না।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতির ধারা পচে গেছে। তারা এখন পচা ডিম। বিদেশিরা এ ডিমে তা দিয়ে কোনো বাচ্চা ফুটাতে পারবে না। জনগণ যেমন বিএনপির কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, ঠিক বিদেশিরাও তাদের কাছ থেকে একসময় মুখ ফিরিয়ে নেবে।’