রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা: ভোগান্তিতে ব্যাংকের আমানতকারীরা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ১০:২২ এএম

সুনামগঞ্জ সদরে ছোটখাটো ব্যবসা করেন মো. আলাউদ্দিন। গত জুনে তিনি সদরের এক খণ্ড জমি ৬০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। এ টাকা দিয়ে একটু ভেতরের দিকে জমি কিনে বাড়ি করার পরিকল্পনা করছেন। তবে ততদিন টাকাগুলোর নিরাপত্তার জন্য গতকাল রবিবার সেখানকার একটি বেসরকারি ব্যাংক শাখায় যান। গিয়ে জানতে পারেন ১০ লাখ টাকার বেশি আমানত হিসাব খুলতে গ্রাহকের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দিতে হবে। এখনই এ প্রমাণপত্র না থাকলে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তা ব্যাংকে জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করে একটি পত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। এসব শর্ত পূরণে রাজি না হয়ে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে ব্যাংক শাখা থেকে বেরিয়ে আসেন আলাউদ্দিন।

আলাউদ্দিনের সঙ্গে দেশ রূপান্তর যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে চান না তিনি। কেননা তার মুদি দোকান ছাড়া অন্য কোনো আয় নেই।

মোবাইল ফোনে আলাউদ্দিন বলেন, ‘একবার রিটার্ন দাখিল করলে প্রতি বছর দিতে হয়। এগুলোর কিছু তেমন বুঝি না। রিটার্ন দাখিলের জন্য আইনজীবী বা আয়কর বিশেষজ্ঞ ধরতে হবে। এর জন্য খরচ আছে। এ কারণে ব্যাংকে হিসাব না খুলে ফেরত চলে যাচ্ছি।’

চলতি অর্থবছর থেকে ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে ব্যাংক শাখাগুলোকে এ নির্দেশনা সার্কুলার আকারে পাঠানো হয়েছে।
 
সার্কুলারে বলা হয়েছে, বর্তমানে যাদের ব্যাংক হিসাব রয়েছে তাদের নথিপত্রের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়া হলে ১৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হবে। যেসব আমানতকারী রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাবেন তাদের জন্য এ কর হবে ১০ শতাংশ।

অর্থ আইন অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা আমানতের প্রাপ্ত সুদ থেকে উৎসে করা কর্তন করে সরকারের কোষাগারে জমা দেয় ব্যাংক।

আগে উৎসে করের ৫০ শতাংশ রেয়াত পেতে শুধু আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) জমা দেওয়ার বিধান ছিল। তা একবারই দিতে হতো। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আয়কর সীমার নিচে থাকা আমানতকারীরা ব্যাংকে আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হবেন বলে জানান ব্যাংকাররা।

সম্প্রতি বিদেশে পড়ালেখা করতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে যান ইব্রাহিম সরকার নামে এক শিক্ষার্থী। কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি বাবদ তাকে ১৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডলার পাঠাতে হবে। কিন্তু ব্যাংকে হিসাব খুলতে গিয়ে জানতে পারেন আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র না থাকলে তিনি হিসাব খুলতে পারবেন না। এর পাশাপাশি সম্প্রতি প্রতিটি ব্যাংক থেকে তাদের গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে বিষয়টি জানানো হলে আমানতকারীদের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয় নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

মূলত সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে ব্যাংক আমানতের মতো ৩৮ ধরনের সেবা প্রাপ্তিতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নতুন এ বিধান রাখার প্রস্তাব করলে জাতীয় সংসদে তা পাসের মধ্যে দিয়ে কার্যকর হয়। তবে গ্রাহকরা বলছেন, তাদের অনেকেরই বাৎসরিক আয় আয়কর সীমার নিচে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি বছর শূন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্যও তাদের ন্যূনতম কিছু খরচ করতে হবে। বিশেষ করে উকিলের ফি ১-২ হাজার টাকা খরচ করতেই হবে।

এ নিয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার গৃহিণী রানী আক্তার এ প্রতিবেদককে জানান, তার স্বামী বিদেশ থেকে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান। এ টাকা তিনি ব্যাংকে মেয়াদি আমানত হিসেবে জমা রাখেন। সম্প্রতি তা ১০ লাখ টাকার বেশি হওয়ায় ব্যাংক থেকে তাকে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তা জমা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি এ রিটার্ন দাখিলের কোনো কিছুই ভালো করে জানেন না।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু গ্রাহকই নয়, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্রের এ বিষয়টি নিয়ে তারাও নানা ধরনের জটিলতার মধ্যে রয়েছেন। গ্রাহকরা আমানত রাখতে চাচ্ছেন না। পুরনো গ্রাহকদের চিঠি দিয়ে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দিতে বলতে হচ্ছে। কোন গ্রাহক জমা দিচ্ছে আর কোন গ্রাহক দিচ্ছে না তা লিপিবদ্ধ করতে হচ্ছে। প্রতি বছরই এ কাজটি করতে হবে। গ্রাহককেও প্রতি বছর শুধু এক কারণে একবার ব্যাংকে আসতে হবে। সবকিছু নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও কাজের চাপ বাড়বে বলে জানান তারা। তারা আরও বলছেন, নতুন করে হিসাব খুলতে গেলে তো রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দিতে হবে, যাদের আগে খোলা হিসাবে ১০ লাখ টাকার বেশি জমা আছে তাদেরও রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আর এফ হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ লাখ টাকার বেশি আমানত ব্যাংকে রাখতে হলে এখন থেকে সবাইকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আপাতত আমরা এ রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র সংগ্রহের জন্য তিন মাস করে দুই দফায় ছয় মাস সময় দেব। এ সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র না জমা দিলে গ্রাহক ব্যাংকে আমানত রাখতে পারবে না। এ নিয়ে সমস্যায় পড়ে যাবে। যা সব ব্যাংকের গ্রাহকের জন্যই প্রযোজ্য।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত