ইরানের আবাদান শহরে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন ধসে ৪১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশটির মানুষ। অর্ধশতাধিক ইরানি পরিচালক-চলচ্চিত্রকর্মী ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। এর জেরে গত মাসে গ্রেপ্তার হন জাফর পানাহি ও মোহাম্মদ রাসুলফের মতো আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালকরা। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
গ্রেপ্তার ৩ পরিচালক
ইরানের তিন আলোচিত চলচ্চিত্র পরিচালককে গত মাসে গ্রেপ্তার করে দেশটির সরকার। এই পরিচালকরা হলেন জাফর পানাহি, মোহাম্মদ রাসুলফ এবং মোস্তফা আল আহমেদ। ভিন্ন মতাবলম্বী দমনের অংশ হিসেবে ইরান সরকারের সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপে সমালোচনার ঝড় ওঠে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে। গ্রেপ্তার হওয়া পরিচালকদের মুক্তির দাবিও তোলা হয়। গত মাসের ৮ তারিখে গ্রেপ্তার হন মোহাম্মদ রাসুলফ ও মোস্তফা আল আহমেদ। এক সপ্তাহ না পেরোতেই কারাগারে ঢোকানো হয় আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত পরিচালক জাফর পানাহিকে। ইরানি পরিচালকদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, তিন চলচ্চিত্র পরিচালক গ্রেপ্তারের পাশাপাশি শিল্পীদের ওপর ইরান সরকারের দমনমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছে। অবিলম্বে মোহাম্মদ রাসুলফ, মোস্তফা আল আহমেদ ও জাফর পানাহিকে মুক্তি দেওয়া হোক। এর আগে ৮ মে রাসুলফ ও মোস্তফার গ্রেপ্তারের ঘটনার নিন্দা জানায় বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এই চলচ্চিত্র উৎসবের নির্বাহী পরিচালক মারিয়েট রিসেনবেক ও আর্টিস্টিক পরিচালক কার্লো শাত্রিয়ান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মোহাম্মদ রাসুলফ ও মোস্তফা আল আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। শিল্পীরা সহিংসতার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করায় গ্রেপ্তার হচ্ছেন, এটি ভয়ংকর বিষয়। আমরা ইরান কর্র্তৃপক্ষের কাছে গ্রেপ্তারকৃত দুই শিল্পীর মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।’
ইরানি পরিচালকদের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে সরকারের কঠোর নীতিমালা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়। তাদের বেশ কটি সিনেমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত ও পুরস্কৃত হলেও সেসব নিজ দেশেই সরকারি বিধিনিষেধের কারণে প্রদর্শন করতে পারেননি তারা। সৃজনশীলতার ওপর ইরান সরকারের দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মোহসেন মাখমালবাফ, আসগর ফারহাদি, মাজিদ মাজিদি, জাফর পানাহি, মোহাম্মদ রাসুলফ, মোস্তফা আল আহমেদসহ বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালকের জন্ম হয়েছে দেশটিতে। এই পরিচালকরাই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন।
কেন গ্রেপ্তার
চলতি বছরের ২৩ মে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবাদান শহরে মেট্রোপল নামে ১০-তলার নির্মাণাধীন এক আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ধসে পড়লে কমপক্ষে ৪১ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় সরকারের অবহেলা ও দুর্নীতিকে দায়ী করে বিক্ষোভ শুরু করে ইরানিরা। বিক্ষোভ দমাতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চলে ব্যাপক ধরপাকড়। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, মেট্রোপল ভবন ধসের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে আবাদান শহরে বিক্ষোভ চলাকালে বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়নের তীব্র প্রতিবাদ জানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছাড়াও দেশটির কমপক্ষে ৭০ পরিচালক ও চলচ্চিত্রকর্মী। তারা ‘বন্দুক ফেলে দাও’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হন। তারা এ-সংক্রান্ত একটি আবেদনে স্বাক্ষরও করেন। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন পানাহি, রাসুলফ ও মোস্তফাও। সে সময় ইরান কর্র্তৃপক্ষ বেশ কয়েকজন পরিচালক ও চলচ্চিত্রকর্মীর বাড়ি ও কার্যালয়ে অভিযান চালায়। গ্রেপ্তার হন চলচ্চিত্র পরিচালক ফিরোজেহ খোসরাভানি, মিনা কেশাভারজসহ আরও কয়েকজন। ইন্সটাগ্রামে ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব পদক্ষেপকে ‘বেআইনি’ অভিহিত করে নিন্দা জানান পরিচালক রাসুলফ ও মোস্তফা। পরে ৮ জুলাই এই দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে দেশের বাইরে অবস্থান করা বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ আনা হয় এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রাসুলফ ও মোস্তফা গ্রেপ্তারের পর পানাহি ইন্সটাগ্রামে বলেছিলেন, ‘ইরানের ৩৩৪ চলচ্চিত্র পরিচালক ও অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রাসুলফ ও মোস্তফা আল আহমেদের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন। এ দুজনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশজুড়ে স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক ও মুক্তমনারা যে দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন, আমরা তার নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা ব্যক্তির মৌলিক অধিকার যে কাঠামোগতভাবে খর্ব করে যাচ্ছে, তারও তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা আমাদের সহকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি চাই। রসুলফ ও মোস্তফার মুক্তির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা চলচ্চিত্র পরিচালক ও শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।’
ইন্সটাগ্রামে এই পোস্টের কয়েক দিন পর রাজধানী তেহরানে রাসুলফের মামলার বিষয়ে খবর নিতে জাফর পানাহি প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে গেলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানাহির এক সহকর্মী জানান, তাকে ইরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে রাখা হয়েছে। গ্রেপ্তারের কয়েক দিন পর আদালত তাকে ছয় বছর জেল খাটার নির্দেশ দেয়। সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে করা মামলায় ২০১১ সালে পানাহির ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়। আদালতের রায়ে সে সময় এও বলা হয়, পানাহি ২০ বছর চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবেন না এবং দেশ ছাড়তে পারবেন না। ওই বছর পানাহিকে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে গোপনে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছিলেন।
জাফর পানাহি
১৯৬০ সালের ১১ জুলাই ইরানের মিয়ানেহ শহরে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জাফর পানাহি। তার বাবা ছিলেন রং মিস্ত্রি। ছোটবেলা থেকে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল পানাহির। ৮ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরা নিয়ে ১০ বছর বয়সেই একটি লেখা লিখে ফেলেন তিনি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার জন্য স্কুল ছুটির পর তিনি নানা ধরনের কাজ করতেন। মজুরি হিসেবে যা পেতেন তাই দিয়ে সিনেমার টিকিট কাটতেন। ২০ বছর বয়সে পানাহিকে বাধ্যতামূলক ইরানের সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হয়। ইরাক-ইরান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন পানাহি। ১৯৮১ সালে কুর্দি বিদ্রোহীরা তাকে ৭৬ দিন আটকে রেখেছিল। মুক্তি পেয়ে পরে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন পানাহি, যা পরে টেলিভিশনে দেখানো হয়। সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ শেষে তেহরানে কলেজ অব সিনেমা অ্যান্ড টিভিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ছাত্রাবস্থায় ইংলিশ পরিচালক আলফ্রেড হিচকক, আমেরিকান পরিচালক হাওয়ার্ড হকস, স্প্যানিশ পরিচালক লুই বুনুয়েল ও ফরাসি পরিচালক জ্যঁ-লুক গোদারের কাজ মুগ্ধ করে পানাহিকে। কলেজে পারভিজ শাহবাজি ও ফারজাদ জোদাতের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শাহবাজি পরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে খ্যাতি পান এবং পানাহির শুরুর দিকের সব ছবির চিত্রগ্রাহকের দায়িত্ব পালন করেন জোদাত।
১৯৮৮ সালে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতক পাসের আগে ও পরে বেশ কটি শর্টফিল্ম বানান পানাহি। ওই সময় প্রখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামি নির্মিত চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন পানাহি। ইরানের নিউ ওয়েভ ফিল্ম মুভমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ নামে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পানাহি। এই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। ওই বছরে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ ক্যামেরা দর পুরস্কারে ভূষিত হয়। ওই প্রথম কোনো ইরানি চলচ্চিত্র কানে এত সম্মানজনক কোনো পুরস্কার পায়। ইরানের অন্যতম সবচেয়ে মেধাবী পরিচালক হিসেবে পানাহির নাম দ্রুত বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। দারিদ্র্যের মধ্যে শৈশব কাটানো পানাহির চলচ্চিত্রে মানবতাবাদী চিন্তাধারার ছাপ পান দর্শকরা। বিশ্বে পানাহির কাজ ব্যাপক সমাদর পেলেও ইরান সরকারের তার চলচ্চিত্রের বক্তব্য ও বার্তা নিয়ে সমস্যা ছিল। এ কারণে পানাহি প্রায়ই তার চলচ্চিত্র নিজ দেশে প্রদর্শনের অনুমতি পেতেন না। এতে অবশ্য পানাহির পথচলা থেমে যায়নি। নিজ দেশে দেখাতে না পারলেও বিদেশে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতে থাকে। চলচ্চিত্রের অনবদ্য ভাষা ও নির্মাণশৈলীর জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়া অব্যাহত থাকে পানাহির। বিশ্বের বিখ্যাত চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক ও সমালোচকরা তার চলচ্চিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করে লেখালেখি করেন। ১৯৯৭ সালে পানাহি নির্মিত ‘দ্য মিরর’ লোকার্নো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লেপার্ড, ২০০০ সালে ‘দ্য সার্কেল’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন, ২০০৬ সালে ‘অফসাইড’ বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার বিয়ার পুরস্কার পায়। পানাহি সম্পর্কে নিউ ইয়র্কে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানিয়ান স্টাডিজ অ্যান্ড কম্পারেটিভ লিটারেচারের অধ্যাপক হামিদ দাবাশি বলেছিলেন, ‘পানাহির চলচ্চিত্র ব্যাপকভাবে সফল কারণ তাকে যা করতে বলা হয়, তিনি তা করেন না; বরং তাকে যা করতে বলা হয় না, তিনি তাই করেন।’
নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে কয়েক বছর ধরে ইরান সরকারের সঙ্গে পানাহির বিরোধ চলছিল। বেশ কয়েকবার তাকে অল্প সময়ের জন্য কারাগারেও থাকতে হয়। এভাবে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলাকালে একপর্যায়ে ২০১০ সালের মার্চে স্ত্রী, মেয়ে, ১৫ বন্ধুসহ পানাহিকে গ্রেপ্তার করে ইরান সরকার। পরে তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগ আনা হয়। বিশ্বের নামকরা চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন পানাহির পক্ষে সে সময় অবস্থান নিলেও ওই বছরের ডিসেম্বরে পানাহিকে সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে করা মামলায় ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। পাশাপাশি তার ওপর ২০ বছর চলচ্চিত্র পরিচালনা, চিত্রনাট্য লেখা, ইরানি বা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া আদালতের রায়ে বলা হয়, চিকিৎসা বা হজ ছাড়া দেশের বাইরে তিনি যেতে পারবেন না।
আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন পানাহি। একদিকে তিনি আপিলের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, অন্যদিকে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। ‘দিজ ইজ নট এ ফিল্ম’ নামের ওই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণশেষে একটি পেন ড্রাইভে কপি করে সেই পেন ড্রাইভ একটি কেকের ভেতর ঢুকিয়ে ইরানের বাইরে পাচার করা হয়। ওই বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাচার করা ‘দিজ ইজ নট এ ফিল্ম’ প্রদর্শন করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পানাহি ও আরেক ইরানি নির্মাতা কামবুজিয়া পারতোভির যৌথ পরিচালনা ও পানাহির চিত্রনাট্যে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ক্লোজড কারটেন’ ৬৩তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শন করা হয়। উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে সিলভার বিয়ার পুরস্কার জেতেন পানাহি। দুই বছর পর ২০১৫ সালে পানাহি নির্মিত ‘ট্যাক্সি’ ৬৫তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে তার ‘থ্রি ফেসেস’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পায়। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা থাকায় পানাহি পুরস্কার নিতে কানে যেতে পারেননি। মেয়ে সোলমাজ পানাহি তার পক্ষে উৎসবে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন এবং তার বক্তব্য পাঠ করে শোনান।
মোহাম্মদ রাসুলফ
ইরানের শিরাজ শহরে ১৯৭২ সালের ১৬ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ রাসুলফ। শিরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক পাস করার পর তেহরানের সুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র সম্পাদনা নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। রাসুলফ নির্মিত ‘দ্য টোয়াইলাইট’ (২০০২), ‘আইরন আইল্যান্ড’ (২০০৫) ও ‘ম্যানুস্ক্রিপটস ডোন্ট বার্ন’ (২০১৩) আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। ২০১১ সালে তার ‘গুডবাই’ সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবের আঁ সার্তে রিগার্ড বিভাগে দেখানো হয়। ওই বিভাগে ‘গুডবাই’ সেরা পরিচালনার পুরস্কার পায়। এ ছাড়া ২০২০ সালে ৭০তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে গোল্ডেন বিয়ার পুরস্কার জেতে রাসুলফের ‘দেয়ার ইজ নো ইভিল’ চলচ্চিত্রটি। ২০১০ সালে অনুমতি ছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিযোগ এনে শ্যুটিং চলাকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছর তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে তার সাজা কমিয়ে এক বছর করা হয়। পানাহির মতো রাসুলফের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে সরকারবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগ আনে ইরান সরকার। তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি দুই বছর চলচ্চিত্র নির্মাণ ও দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
মে মাসে আবাদান শহরে ১০-তলা নির্মাণাধীন ভবন ধসে ৪১ জনের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর কারণে গত মাসে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক ইরানি পরিচালক হলেন মোস্তফা আল আহমেদ। ২০০৯ সালে তিনি ‘পুসতেহ’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।
