চট্টগ্রামের মিরসরাই উপকূলে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। প্রতিবছর এ সময় সাগরে নামলেই জেলেদের জালে ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই চিরচেনা দৃশ্য যেন হারিয়ে গেছে।
৬৫ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় সাগরে নামলেও অধিকাংশ নৌকা ফিরছে প্রায় খালি হাতে। কোথাও দুই-এক কেজি, কোথাও পাঁচ-ছয় কেজি ইলিশ মিললেও তা দিয়ে জ্বালানি, বরফ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ উঠছে না। ফলে হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উপকূলের শত শত মৎস্যজীবীর।
মিরসরাইয়ের ডোমখালী, সাহেরখালী, বামনসুন্দরা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সাগর থেকে ফিরে অনেক জেলে মাছ বিক্রির পরিবর্তে উপকূলে বসেই ছেঁড়া জাল সেলাই করতে ব্যস্ত। কারও জাল বড় বড় অংশে ছিঁড়ে গেছে, কারও জালের একাধিক জায়গা কেটে নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ ধরার পরিবর্তে দিনের পর দিন জাল মেরামতেই সময় চলে যাচ্ছে তাদের।
জাল মেরামত করতে থাকা মৎস্যজীবী অভিসরণ দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাগরে মাছ তো পাচ্ছিই না। তার ওপর বলগেট (বাল্কহেড) জাহাজ চলাচলের সময় প্রপেলারে জাল কেটে যাচ্ছে। একটি জাল মেরামত করতেই অনেক টাকা খরচ হয়। নতুন জাল কিনতে হলে আরও বড় অঙ্কের টাকা লাগে। মাছ নেই, তার উপর জালও নষ্ট হওয়ায় আমরা এখন চরম বিপদে আছি।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, উপকূলে বালু উত্তোলনে নিয়োজিত অনঅনুমদিত বাল্কহেড জাহাজের অবাধ চলাচলের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজের শব্দ, কম্পন এবং প্রপেলারের তীব্র ঘূর্ণিতে মাছ উপকূলীয় এলাকা এড়িয়ে যাচ্ছে বলে তাদের দাবি। পাশাপাশি শিল্পকারখানার মালামালবাহী জাহাজের প্রপেলারে জাল কেটে যাওয়ার ঘটনাও প্রায় নিয়মিত ঘটছে। এতে প্রতিটি ট্রিপেই বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ।
মৎস্যজীবী সুধাংশু দাশ বলেন, সাগরে গিয়ে সারাদিন জাল টেনে যে মাছ পাই, তা বিক্রি করে নৌকার খরচও ওঠে না। তেল, বরফ, খাবার আর শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার পর হাতে কিছুই থাকে না। এভাবে চলতে থাকলে মাছ ধরা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
জেলেরা জানান, মৌসুম শুরুর আগে অনেকেই ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ ও দাদন নিয়ে জাল, নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন। ভালো ইলিশের আশায় নেওয়া সেই ঋণ এখন তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় এমনকি পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপকূলীয় জেলে সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হরিলাল জলদাশ বলেন, বঙ্গোপসাগরের এ চ্যানেল দিয়ে একসময় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও বর্তমানে কলকারখানা চালু হওয়ায় সেসবের বর্জ্য সাগরের পানি দূষিত করে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যহত করছে। পাশাপাশি সাগর থেকে নিয়মিত যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সেটাও একটি কারণ হতে পারে। আমার জেলে সম্প্রদায় এখন পেশা নিয়ে হুমকির মুখে। আগামী কয়েক বছরে এখানে মৎসজীবি বলতে কোন পেশা থাকবে বলে মনে হয় না।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিরসরাই উপকূলের ঘাটগুলোতে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মিরসরাইয়ের ইলিশ বাজার পর্যন্ত আসছে না। আমরা আড়ত থেকে ইলিশ নিয়ে এসে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছি। সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম বেশি।
মৎস্যজীবীরা উপকূলে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন ও বাল্কহেড জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রপেলারে জাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া জেলেদের ক্ষতিপূরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।
এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, মিরসরাই উপকূলে ইলিশের বিচরণ উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে। জলবায়ূ পরিবর্তন, কলকারখানার বর্জ্য সাগরের পানিতে মিশে পাশি দূষিত হওয়া এটির একটি অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি মালামালবাহী জাহাজ যেহেতু এ চ্যানেল দিয়ে চলাচল করছে সেহেতু এ চ্যানেল এখন মাছের বিচরণের জন্য উপযুক্ত না। শুধু ইলিশ না অন্যান্য মাছও কমেছে। ইলিশ কম পাওয়ার আরো একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে জেলেদের গভীর সাগরে না যাওয়া এবং উপযুক্ত জাল ব্যবহার না করা।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন কারণে এ অঞ্চলের জেলেদের মাছ ধরা বিঘ্নিত হওয়ায় আমরা সরকারি সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়েছি।
