আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় দেড় বছর বাকি। বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামতে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছে। একই সঙ্গে দাবি আদায়ে বিদেশিদের সমর্থন পেতে কূটনীতিক তৎপরতাও জোরদার করেছে। কয়েকটি দেশ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা ছাড়াও বিএনপিকে নির্বাচনের আনার ব্যাপারে চাপ দিচ্ছে। বিএনপির আন্দোলন প্রস্তুতি ও বিদেশিদের চাপ মাথায় রেখে আওয়ামী লীগও প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাল্টা কৌশল হিসেবে বিদেশিদের সঙ্গে আলোচনায় বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে রাজি করানোর জন্য বলছে দলটি।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন কৌশলের বিষয়ে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে। দেশের জনগণের প্রতি দলটির কোনো আস্থা নেই।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি বিদেশিদের কাছে বারবার ধরনা দিচ্ছে। কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছে বিভিন্ন দেশে। তাই নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য বিদেশিদের কাছ থেকে আসছে।’
ফারুক খান বলেন, ‘সংবিধানের বাইরে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। দেশে সংবিধান সম্মতভাবেই নির্বাচন হবে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব দেশ আমাদের অংশগ্রহণমূলক ও বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে কথা তুলছে, আমরা তাদের বলছি, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে আপনারা উদ্যোগ নেন।’
গত বছর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একপর্যায়ে বিএনপি ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ‘ভোট ডাকাতি’র অভিযোগ তুলে ভোটের মাঠ ছাড়ার ঘোষণা দেয়। ওই ভোটে যদিও দলটির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। সাত ধাপে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৩৬৮টিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। যদিও বিএনপি আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলে আসছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তারা এ ব্যাপারে সোচ্চার। দলটি এ দাবিতে এখন পর্যন্ত অনড়। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিষয়ে তাদের নানা অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ কয়েকটি দাবিতে বিএনপি আন্দোলনমুখী।
এর মধ্যে গত মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর আগে গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ওয়াশিংটনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চান বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। এরপর থেকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় বলে বক্তব্য দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়েও অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলেছেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডাসহ বিদেশে কূটনীতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বিএনপি। এ বিষয়টি গণমাধ্যমে যেমন এসেছে তেমনি সরকার ও রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা হচ্ছে। ফলে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না বিদেশিদের এমন অবস্থান ইতিমধ্যেই সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ অন্যদের সঙ্গে নির্ধারিত বা অনির্ধারিত আলোচনায় বিদেশিরা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা উঠলেই তারা জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায় তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের অনেকেই সরাসরি বিএনপিকে নির্বাচনে দেখতে চায় বলেও জানিয়েছে। ফলে বিএনপিবিহীন আগামী নির্বাচন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে আওয়ামী লীগও মনে করছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশিদের এই চাপ মোকাবিলা করতে ক্ষমতাসীন দলও পাল্টা কৌশল গ্রহণ করেছে। সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যখনই কোনো বিদেশি প্রতিনিধিদলের নির্বাচনসংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা হয় তখন তাদের তরফ থেকে জানানো হয় যে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে উদ্যোগ বিদেশি ওই প্রতিনিধিরাও গ্রহণ করতে পারে।
ওই নেতারা জানান, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে যুক্তরাষ্ট্রকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের অনুরোধের বিষয়টি যেভাবে গণমাধ্যমে এসেছে সেটা আসলে পাল্টা চাপের কৌশল থেকেই বলা হয়েছে। তারা বলছেন, গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন সেখানেও বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে তাদের উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন নিয়ে বিদেশি চাপ আমলে নিয়েছে সরকার। ফলে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আসুক তা চায় ক্ষমতাসীনরা। বিএনপির প্রতি আরও নমনীয় হয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে বিএনপির কর্মসূচিতে বাধাও দেওয়া হবে না। তবে কর্মসূচির নামে জ¦ালাও-পোড়াও করলে ছাড় দেওয়া হবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গত সপ্তাহে তিনি ওই কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে জানান, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায় তার দেশ। বিএনপিকেও তারা নির্বাচনে দেখতে চান। ওই নেতা জানান, তিনি জবাবে বলেছেন যে আওয়ামী লীগও আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে দেখতে চায়। তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর করে আসা আওয়ামী লীগের ওই নেতা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন বিএনপি মনে করে এই সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। তার জবাবে তিনি বলেছেন, সরকারও সংবিধানের বাইরে কোনো সুযোগ তৈরি করে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ক্ষমতা রাখে না। তবে নির্বাচন নিয়ে সংশয় থাকলে সেটা পর্যবেক্ষণ করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
সূত্র জানায়, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ হয় সরকারের দুজন মন্ত্রীর সঙ্গে। কানাডার ও জার্মান প্রতিনিধির সঙ্গেও কথা হয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর অন্য এক সদস্য ও দুজন সম্পাদকমন্ডলীর নেতার সঙ্গে। গত মাসের শুরুর দিকে ও শেষ সপ্তাহে তারা ওই প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই দেশগুলোর প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে সেটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি না সেই প্রশ্নও তোলেন তারা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এর জবাবে জানানো হয়েছে, বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য দেশগুলোর পক্ষ থেকেও উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এর জন্য আলাপ-আলোচনায় বসার প্রয়োজন মনে করলে তাতে রাজি ক্ষমতাসীনরা। বিদেশি ওই প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বলা হয়েছে, বিএনপিকে নির্বাচনে ফেরাতে সরকার বা আওয়ামী লীগের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে হবে না। বিএনপিরও ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে হবে।
জানা গেছে, ওইসব আলোচনায় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ করতে বিএনপির সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব থাকলে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পৃথিবীর নামি-দামি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানও আসতে পারে। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে একতরফা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশিরা কে কী বলল সেটা আমি ফলো করি না। কোন দল নির্বাচনে আসবে কী আসবে না সেটা একান্তই সেই রাজনৈতিক দলের ব্যাপার। বিএনপির তো বিদেশপ্রীতি বেশি। তাই বিদেশিদের কাছে ধরনা দিচ্ছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছে। ফলে টাকা হালাল করার ব্যাপার আছে। সংবিধানের আলোকেই যথাসময়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হবে।’
