টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে যেভাবে ডাকাতি ও ধর্ষণ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০৭:৫০ পিএম

টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতির সময় এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণসহ একাধিক নারীর শ্লীলতাহানি করেছে ডাকাতেরা। ডাকাত দলটি পেশাদার। তাদের মধ্যে অন্তত সাতজন ছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত তৈরি পোশাক কারখানার কর্মী। ডাকাত দলের হোতা মো. রতন হোসেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঠান্ডা মাথায় তারা ডাকাতি করে। ডাকাতি শেষে বাসে মালামাল ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব হলে চালকের আসনে থাকা ডাকাত দুর্ঘটনায় পড়ে। রতনের নেতৃত্বে গত ৬ মাসে অন্তত ১০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সময় এ চক্রের সদস্যরা জেলও খেটেছে।

বহুল আলোচিত এ ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী রতন হোসেনসহ চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব।  

রবিবার র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-১৪ ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করে। এর আগে এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তাররা হলেন, ডাকাত চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী মো. রতন হোসেন (২১), মো. আলাউদ্দিন (২৪), মো. সোহাগ মন্ডল (২০), খন্দকার মো. হাসমত আলী ওরফে দীপু (২৩), মো. বাবু হোসেন ওরফে জুলহাস (২১), মো. জীবন (২১), মো. আব্দুল মান্নান (২২), মো. নাঈম সরকার (১৯), রাসেল তালুকদার (৩২), ও মো. আসলাম তালুকদার ওরফে রায়হান (১৮)।

তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি মোবাইল, ২টি রূপার চুড়ি, ১৪টি সিমকার্ড ও ডাকাতিতে ব্যবহৃত ১টি দেশীয় অস্ত্র (ক্ষুর)।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে রতন মিয়া বাস ডাকাতির ৩ দিন আগে তার সহযোগী রাজা মিয়াকে প্রস্তাব দেয়। রাজা মিয়া দলের অন্যান্য ডাকাতদের সংঘটিত করার কথা বলে। পরে রতন, মান্নান, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নুরনবীকে ডাকাতির পরিকল্পনার কথা জানায়। মান্নান তার সহযোগী সোহাগ, আসলাম, রাসেল, নাঈম ও আলাউদ্দিনকে নিয়ে ডাকাতিতে যোগ দেয়। রতনের নেতৃত্বে মোট ১৩ জন ডাকাত অংশ নেয়।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রতনের নেতৃত্বে গত ২ আগস্ট দুপুরে গাজীপুরের জিরানী বাজার এলাকায় সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসে ডাকাতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। রতন ডাকাতি কাজে যাবতীয় প্রস্তুতির আর্থিক খরচ বহন করে। চক্রের সদস্যদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে প্রত্যেকের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রতন ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাকু, ২টি ধারালো কাঁচি ও ১টি ক্ষুর সংগ্রহ করে।

ডাকাতির ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার রাতে ডাকাত রাজাসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় পৌঁছালে ডাকাত রাজা বাসটিকে থামার সংকেত দেয় এবং যাত্রীবেশে প্রথমে রতন, রাজা, মান্নান ও নুরনবী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহন বাসটিতে ওঠে। পরে আরো দুই দফায় ডাকাতচক্রের অন্য সদস্যরা বাসটিতে যাত্রীবেশে ওঠে। বাসে ২৪ জন সাধারণ যাত্রী থাকায় ডাকাত চক্রের অধিকাংশ সদস্য পেছনের দিকে বসে। বাসটি বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু এলাকা অতিক্রম করলে রতন ডাকাত দলের সদস্যদের চাকু ও ধারালো কাঁচি দেয়। আউয়াল ধূমপানের কথা বলে বাসের গেটের কাছে যায় এবং অন্যান্যদের ইশারা দিলে রাজা, রতন, মান্নান ও নূরনবী চালকের সিটের কাছে গিয়ে চালকে মারধর করে এবং রতন বাসের ড্রাইভিং সিটে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা বাসের চালক ও সুপারভাইজার, হেলপারসহ অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদের হাত-মুখ বেঁধে সিট কভার দিয়ে মুখে মুখোশ পড়িয়ে মুখমণ্ডল ঢেকে দেয় এবং যাত্রীদের সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে এবং শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের হাটুভাঙ্গা মোড় হয়ে মধুপুরে যাওয়ার পথে রক্তিপড়া এলাকায় লুটকৃত মালামালের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এর কারণে চালক রতন পেছনে তাকালে রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বালুর সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ হলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একপাশে হেলে পড়ে। তৎক্ষণাৎ ডাকাত দলের সবাই লুটকৃত মালামালসহ বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়।

র‍্যাব কর্মকর্তা বলেন, তারা অন্য বাসে করে টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় যায় এবং অটোরিকশাযোগে মধুপুরের কুড়ালিয়া এলাকায় রতনের নিকটাত্মীয়ের ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে লুণ্ঠিত মালামাল নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে। পরে বিভিন্ন স্থানে তারা আত্মগোপনে চলে যায়।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারকৃত রতন হোসেন ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী। সে পেশায় গাড়ির হেলপার তার বিরুদ্ধে পূর্বেও ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে। সে ২০১৮ সালে নূরনবী, জীবন ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সাভার পরিবহনের একটি বাস ডাকাতি করে। ওই বাস ডাকাতির ঘটনায় রতন গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে ২০২০ সালে পুনরায় নূরনবী, জীবন ও আউয়ালকে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অটোরিকশা ছিনতাই করে। তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা জীবনকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে। ওই ঘটনায় দায়ের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রতন প্রায় ১ বছর কারাভোগ করে। কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে সে তার সিন্ডিকেট নিয়ে সাভার, গাজীপুর বা সিরাজগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কে আরো বেশ কয়েকটি ডাকাতি করে। গ্রেপ্তার জীবন পেশায় গাড়ির হেলপার। এই পেশার আড়ালে সে বেশ কয়েকটি পরিবহন ডাকাতিতে অংশ নেয়। ২ আগস্টের ডাকাতিতে সে যাত্রীদের মালামাল লুটের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ইতিপূর্বে সে ২০১৮ ও ২০২০ সালে দুটি ডাকাতির মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরাও পেশাদার ডাকাত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত