অভিযোগের পেছনের কারণ জানাবে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার আসছেন আজ

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০৯:২৪ এএম

বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য তথ্যের ওপর নির্ভরতা চায় জাতিসংঘ। এমনকি এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় কোনো পক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নয়, সরাসরি তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে সংস্থাটির। সেই লক্ষ্যেই জাতিসংঘের বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত মিশেল ব্যাচেলেট আজ রবিবার চার দিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন।

জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সদর দপ্তর এক বার্তায় মিশেল ব্যাচেলেটের সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখতে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণেই তার এ সফর। জাতিসংঘের কোনো মানবাধিকারপ্রধানের বাংলাদেশে এটিই হবে প্রথম সরকারি সফর। ফলে মিশেল ব্যাচেলেটের এ সফরকে বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের প্রকৃত অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ হিসেবে দেখছে।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তাকে স্বাগত জানাই। এই প্রথমবারের মতো কোনো মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বাংলাদেশ সফরে আসছেন। মানবাধিকার বিষয়ে আমরা আমাদের দেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাব। এটা নিয়ে আমরা কী করেছি এবং কী করতে চাই, তাও জানাতে পারব। আমাদের নিয়ে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে আমরা বলতে পারব। কী কী কারণে এসব অভিযোগ এবং এসবের প্রেক্ষাপটও আমরা তুলে ধরতে পারব।’

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়গুলো সম্পর্কে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় সংবাদপত্রে কোনো অভিযোগ প্রকাশ হওয়ার পর সেটি অনুসন্ধানে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু এটি যেহেতু ছাপা হয়েছে, সেটি অভিযোগের তালিকার মধ্যে ঢুকে যায়। আবার কিছু কিছু এনজিও, যেমন অধিকার এমন সব খবর দেয় যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। আবার আমরা দেখছি, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়ে এ ধরনের ভিত্তিহীন কিছু রিপোর্ট হয়েছিল। আমরা এসব বিষয়ও হাইকমিশনারের কাছে তুলে ধরব।’

সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলেছে, এটা সরকারের আমন্ত্রণ হলেও বহু কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসার অনুমতি পেয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কোনো হাইকমিশনার। অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ইস্যুতে সোচ্চার থাকা বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিদের সফরের বিষয়টিকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হতো আগে। এবার বাংলাদেশও চেয়েছে এই সফর। এ সফরে মিশেল ব্যাচেলেট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সরকারের উচ্চপর্যায় ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি, মানবাধিকার সংগঠক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। যাবেন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনেও। সফর শেষ করার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন ব্যাচেলেট।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) পশিমা দেশগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বরাবরই বেশ সোচ্চার। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের বিভিন্ন অভিযোগ বারবারই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে কেস বাই কেস যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, ঢাকার পক্ষ থেকে সেগুলোরও তথ্য-উপাত্তসহ যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য জবাব তুলে ধরা হয়েছে। এবারও তাই করা হবে।

মিশেল ব্যাচেলেট জাতিসংঘে মানবাধিকারবিষয়ক বৈঠকগুলোতে সংস্থাটির মহাসচিবের প্রতিনিধিত্বও করে থাকেন। তার ঢাকা সফরকে সামনে রেখে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশের সরকারকে যেন তিনি চাপ দেন, সেই আহ্বান জানিয়েছে ৯টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।

জানা গেছে, ‘বাংলাদেশের ৬৬টি স্পর্শকাতর নিখোঁজের’ ঘটনায় বাংলাদেশের দেওয়া জবাবকে ‘অপর্যাপ্ত’ বলে এরই মধ্যে জানিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল। ‘গুমের’ এসব অভিযোগের বিষয়ে জাতিসংঘের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। গত ২০ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হয়। এরপর ৬ ডিসেম্বর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন হালনাগাদ করে ওয়ার্কিং গ্রুপ। ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ প্রকাশিত মানবাধিকার কাউন্সিলের রিভিউয়ে ‘অপর্যাপ্ত’ তথ্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এতে ‘নিখোঁজ হওয়া’ ব্যক্তিদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাদের আত্মীয়স্বজনকে ‘হয়রানি’ বন্ধেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এরই মধ্যে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৮ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যপদে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ। সে সময় ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের ভোটের মধ্যে ১৭৭টি দেশের সমর্থন পেয়ে বাংলাদেশ সদস্য নির্বাচিত হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দেশ পরপর দুবার সদস্য হয়ে কাজ করতে পারে। তিন বছর মেয়াদের ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ দুই দফায় টানা ছয় বছর গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্বের অংশীদার হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী ২০২২ সালে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে ঢাকা। আগামী অক্টোবরের ওই নির্বাচনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চারটি আসনের বিপরীতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ কোরিয়া, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম, বাহরাইন, কিরগিজস্তান ও আফগানিস্তান। গত মঙ্গলবার এ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন ও দূতাবাসগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর)’ নিয়ে আলোচনা হবে : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্র, নাগরিকের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকারসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতির প্রশ্নে ঘনিয়ে আসছে ‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর)’ বা সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা। আগামী বছর জুনে ইউপিআরের বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জাতীয় প্রতিবেদন দিতে হবে বাংলাদেশকে। এর আগে নভেম্বরে চতুর্থবারের মতো পর্যালোচনায় অংশ নিতে হবে। ইউপিআর জাতিসংঘ মানবাধিকার কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। যার আওতায় প্রতি পাঁচ বছর পর সদস্যরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৪ মে তৃতীয়বারের মতো এ প্রক্রিয়ার আওতায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পর্বের ইউপিআরের পর গৃহীত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার কতটুকু অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা ওই অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়।

জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, ১৮ ও ১৯ মে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথ কমিশনের বৈঠকেও বাংলাদেশের বর্তমান সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। যদিও ওই আলোচনা বা ‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউয়ে’ শুধুই নির্দিষ্ট একটি দেশের পরিস্থিতি থাকবে বিষয়টি এমন নয়। যেসব সদস্য দেশ মানবাধিকার সুরক্ষা, গণতন্ত্র, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী-শিশু অধিকারে প্রতিশ্রুতিসহ অন্য বিষয়গুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, এমন দেশগুলো প্রশ্নের মুখে পড়বে। বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ থাকলেও পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে সহযোগিতা করার বিষয়টি উল্লেখ করে এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়েছে ইইউ। গত ২০ মে ইইউ কমিশনের জারি করা বিবৃতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, জাতি, বয়স, লিঙ্গপরিচয়, যৌন অভিমুখিতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থসামাজিক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও স্থান পেয়েছে। বিবৃতিতে আগামী বছরের আগেই বাংলাদেশের মানবাধিকার ইস্যুতে বৈশি^ক সর্বজনীন পর্যালোচনার প্রতিবেদন দাখিল করার বিষয়টি এরই মধ্যে পরিষ্কার করেছে ইউপিআর।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘আর্টিকেল নাইনটিনের’ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন, ‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউয়ে বাংলাদেশ বা যেকোনো সদস্য দেশের ওপর যখন কথা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। সুপারিশগুলোতে কোনো কোনো দেশ আপত্তি জানায় বা সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেয়।  পরবর্তী রিভিউয়ে আবার উন্নতির বিষয়গুলো দেখা হয়। যদি উন্নতি ঘটে সে ক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হয়, নয়তো আবারও সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে নতুন বিষয় ঘটে থাকলে সেই বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পায়। এটা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। তবে এ ধরনের আলোচনায় থাকাটা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য ইমেজের প্রশ্ন।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে মানাবাধিকার সংগঠনগুলোও তাদের সুপারিশ তুলে ধরে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউয়ে তারা তিনটি প্রতিবেদন বিবেচনা করে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার কী বলছে। দ্বিতীয়ত, ওই দেশের সিভিল সোসাইটি কী বলছে এবং সর্বশেষ মানবাধিকার কমিশন কী বলছে। আমরাও আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন জমা দেব, এটা শুধু আমরাই না পৃথিবীর সব দেশ নিয়েই এমন প্রতিবেদন জমা হয়।’

ফারুখ ফয়সল আরও বলেন, ‘যখন একটি দেশ সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক হবে, নিপীড়নমূলক আইনের প্রয়োজন হবে না এবং দেশের অংশীজনদের মধ্যে আলোচনা করে যখন সিদ্ধান্ত নেবে, কেবল তখনই ইউপিআরে এ ধরনের ইমেজ রক্ষা করা সম্ভব। নয়তো এ ধরনের আলোচনা চলতেই থাকবে। আলোচনায় যে দেশের যে প্রতিনিধি থাকেন, এটি তার জন্য বেশ বিব্রতকর।’

‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর)’ বা সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনার প্রস্ততি কতটা রয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে সরকারের অংশীজনদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই বৈঠক হয়। সেখানে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নির্ধারণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ ও তার অগ্রগতির ফলোআপ হয়। এ কারণে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার কিছু নেই। প্রক্রিয়াগত যে প্রস্তুতি রয়েছে তার মধ্য দিয়েই কৌশলগত দিক নির্ধারিত হবে। মিয়ানমার, ভেনেজুয়েলা, চীন, কিউবাসহ আরও বহু দেশ রয়েছে যাদের মানবাধিকার ও অন্য বিষয়গুলো বেশ খারাপ। সে তুলনায় আমরা অনেক ভালো আছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত