ইদানিং বিএনপির কর্মসূচিতে দলের নেতাকর্মীরা লাঠি বহন করছেন। লাঠির মাথায় থাকছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। লাঠি বহনকারী নেতাকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কাউকে আঘাত করার জন্য লাঠি বহন করছি না। তবে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে লাঠি বহন করবো আমরা। আমাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সন্ত্রাসের পথে। লাঠি বহন করলেও আমরা কাউকে আঘাত করিনি। এমন কোনো ভিডিও ফুটেজ কিংবা ডকুমেন্ট কেউ দেখাতে পারবে না।’
কী কারণে নেতাকর্মীরা লাঠি বহন করছেন সে সম্পর্কে সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) হাজারীবাগে শিকদার মেডিকেল কলেজের সামনে বিএনপির সমাবেশে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘আজকে যে ঝড়-ঝাপ্টা গেছে, অলি-গলি থেকে ওরা (আওয়ামী লীগ) আমাদের ওপরে গুপ্ত হামলা করেছিল। পুলিশ যদি আমাদের জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় বেতনভুক্ত না হয়ে ওদের দলীয় কর্মী হতো তাহলে আমরা এখানে সভা করতে পারতাম না। এজন্য আমি পুলিশ ভাইদের ধন্যবাদ দেই। গণতন্ত্র আদায়ের আন্দোলনে আঘাত আসলে পাল্টা আঘাত করা হবে।’
এর আগে, ১৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের পল্লবীতে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। সে সময় পল্লবী থানার ওসি পারভেজ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাশাপাশি মাঠে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমাবেশ ছিল। দুই দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়ায়। পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে লাঠিচার্জ করে ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।’
তবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান অভিযোগ করে বলেন, ‘বিনা উসকানিতে রাজধানীর মিরপুরে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে অতর্কিত আমাদের ওপর হামলা করে। এ অবস্থায় আমাদের নেতাকর্মীরা যখন আহত তখন পুলিশ আবার আমাদের দিকেই টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ও গুলি বর্ষণ করে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিরপুরের পর মুন্সীগঞ্জে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হঠাৎ করে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে। পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে যুবদলের নেতা শহীদুল ইসলাম শাওনসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। তাদের চিকিৎসার জন্য নিলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাতে বাধা দেন। পরে শাওনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরেরদিন শাওন মারা যায়।’
তিনি বলেন, ‘এরপর নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন কর্মীরা। বনানীতে প্রথম এটা দেখা গেছে। এখন প্রতিটি কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা এভাবেই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। আমাদের নেতাকর্মীরা আক্রমণের শিকার হলে নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। মার খাওয়ার জন্য আমাদের জন্ম হয়নি। এ পর্যন্ত ভোলায় নূরে আলম ও আব্দুর রহিম, নারায়ণগঞ্জে শাওন প্রধান ও মুন্সীগঞ্জে শহীদুল ইসলাম শাওন মারা গেছেন। সারাদেশে কয়েক হাজার নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।’
এছাড়া সাম্প্রতিক সমাবেশগুলোতে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছেন, ‘আর মার খাবো না। এবার প্রতিরোধ গড়ে তুলবো। আমরা আগে আক্রমণাত্মক হব না। তবে আঘাত করলে আমরা পাল্টা আঘাত করবো। লাঠি হাতে রাখবো নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে।’
সমাবেশে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমি তাদেরকে চিনি। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের রাতে রাজারবাগে পুলিশ লাইনে আক্রমণ করেছিল সেদিন পুলিশরা তা প্রতিহত করেছিল। সেইদিন সৌভাগ্যক্রমে আমি তাদের সাথে ছিলাম। আমি দেখেছি তার পরের দিন কত হাজার হাজার পুলিশের লাশ নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা কোথায় গায়েব করে দিয়েছিলো। মানুষ জানে না। সেই পুলিশ ভাইয়েরা যে গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছিল আপনারা তার উত্তরসুরী। আপনারা গণতন্ত্রের জন্য জনগণের পক্ষে রুখে দাঁড়াবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সময় এসে গেছে আপনারা জনগণের কাতারে ফিরে আসুন, জনগণের সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেন।’
সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আমি হঠাৎ করে দেখলাম আমাদের ছেলেদের হাতে লাঠি। আমি একটু শঙ্কিত হলাম। বিএনপি কেনো লাঠি নিয়ে এসেছে সেটা বলবে না। বিএনপির ভালো কর্মীদেরকে মারতে মারতে এমন একটায় জায়গায় নিয়ে গেছে যে, তারা আজকে আত্মক্ষার জন্য লাঠি হাতে নিয়েছে।’
বেসরকারি একটি টেলিভিশনের টক শোতে বিএনপির সমাবেশে কেনো লাঠি তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সম্পর্কে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘টেলিভিশনের টক শোতে বিএনপির লাঠি নিয়ে আলোচনা কইরেন না। লাঠি আপনারা তুলে দিয়েছেন। বিএনপির কর্মীরা নিজ ইচ্ছায় লাঠি তোলে নাই।’
বেসরকারি টেলিভিশনের কর্তাব্যক্তিদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘টেলিভিশন হইয়া কাউরে অন্ধভাবে সাপোর্ট কইরেন না। জনগণের পক্ষে অবস্থান নেন। জনগণ শুধু মার খাবে? আপনাদেরকে বলতে হবে কেনো বিএনপির কর্মীরা লাঠি হাতে মিছিল করছে? একবার বলবেন ওখানে, আরেকবার বলবেন এখানে, আগামীদিন বলবেন ওখানে, আবার বলবেন হবে না। একবার পারমিশন দেবেন, আবার বাতিল করবেন, আবার এমন সময় উনারা পারমিশন দেবেন ওরা (আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা) অস্ত্র নিয়ে আসবে।’
