নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে ইরানে চলমান বিক্ষোভের একজন আইকন নিকা সাকরামি নামের এক কিশোরীর মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত শুরুর পর মিথ্যাচার শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভের শুরুর দিকেই মৃত্যু হয় এই স্কুলছাত্রীর।
চলতি সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পর ইরানের হাইস্কুল ছাত্রীরাও এই বিক্ষোভে যোগ দিলে এই পদক্ষেপ নেয় দেশটির কর্তৃপক্ষ। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পরপরই হিজাবকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার সময়ও হাইস্কুলছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায় স্কুলের ভেতরে ছাত্রীরা মাথার হিজাব খুলে ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু চাই’ স্লোগান দিচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির ছবি পদদলিত করতেও দেখা গেছে। তাদের ছবির দিকে ছাত্রীরা নিজেদের হাতের মধ্যমা আঙ্গুলও প্রদর্শন করে। রাস্তার বিক্ষোভেও যোগ দিয়েছে স্কুলছাত্রীরা।
চলমান বিক্ষোভে অংশ নেয়া দুই কিশোরীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ইরানের নৈতিকতা পুলিশের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ১৬ বছর বয়সী সারিনা ইসমাইলজাদেহর মাথায় লাঠি (ব্যাটন) দিয়ে আঘাত করা হয়।
নিহত কিশোরী নিকা সাকরামিও চলতি সপ্তাহান্তে ১৭ বছর বয়সে পা রাখতেন। তিনি ইতিমধ্যেই অনলাইনে বিক্ষোভকারীদের আইকনে পরিণত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি বিক্ষোভের প্রথম দিনগুলোতেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কয়েকদিন নিখোঁজ থাকার পর তার পরিবার নিকার মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে পারে।
কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, নিকার শরীরে কোনো গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং সে সম্ভবত বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে।
বিবিসি জানায়, বুধবার রাতে ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলের খবরে তার খালা আতাশ এবং খালু মোহসেনকে বলতে বাধ্য করা হয়েছে যে, সে ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে।
আতাশ তার ভাগ্নী নিকা সাকরামির মৃত্যুর খবর অনলাইনে পোস্ট করার পর তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।
এর আগে সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, তেহরানের পাবলিক প্রসিকিউটর আলি সালেহি মঙ্গলবার গভীর রাতে বলেন, ‘নিকা সাকরামির মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য ফৌজদারি আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্তের নির্দেশ জারি করা হয়েছে’।
আরেক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম জানায়, নিকার মৃত্যুর ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরপর বুধবার রাতেই তার খালা আতাশ এবং খালু মোহসেনকে বলতে বাধ্য করা হয়েছে যে, সে ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে।
ইরানের বিচার বিভাগ বলেছে, যে রাতে নিকা নিখোঁজ হয় সে রাতেই সে একটি ভবনের ছাদে যায়, যেখানে আটজন নির্মাণ শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন এবং পরের দিন সকালে তাকে ভবনের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
তেহরানের বিচার বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহরিয়ারি বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলেন, ময়নাতদন্তে দেখা গেছে যে, নিকার দেহের হাড় অনেক জায়গায়- শ্রোণী, মাথা, উপরের এবং নীচের অঙ্গ, বাহু এবং পায়ের হাড় ভাঙ্গা; যা থেকে বোঝা যায় যে, তাকে অনেক উঁচু জায়গা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল’।
তিনি ঘোষণা করেন যে, এ থেকে প্রমাণিত হয়, তার মৃত্যুর সঙ্গে বিক্ষোভের কোনও সম্পর্ক নেই।
তবে, বিবিসি ফারসি বিভাগের হাতে আসা তেহরানের কবরস্থান থেকে জারি করা একটি মৃত্যুর সনদপত্রে বলা হয়েছে, ‘শক্ত কোনো বস্তুর একাধিক আঘাতের কারণেই’ নিকা মারা গেছেন।
আতাশও এর আগে জানান, ইরানের রোভোল্যুশনারি গার্ড তাকে বলেছিল তার ভাগ্নি ৫দিন তাদের হেফাজতে ছিল। এরপর তাকে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আতাশ আরও জানিয়েছিলেন, নিকা নিখোঁজ হওয়ার পরে তার ইনস্টাগ্রাম এবং টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টগুলোও মুছে ফেলা হয়েছিল।
সঠিক নিয়মে হিজাব না পরার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশি হেফাজতে মাশা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুতে গত ১৬ অক্টোবর থেকে ইরানে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ আজ ২১ দিনে গড়িয়েছে। এ বিক্ষোভে দেশটির সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সামিল হয়েছে। বিক্ষোভে এরই মধ্যে দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯টি শিশু এবং বেশ কয়েকজন নারীও রয়েছেন।
প্রতিবাদকারীদের দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ব্লকসহ ইন্টারনেটে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে এর পরও থামছে না বিক্ষোভ-সহিংসতা।
অসলোভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) এর সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ইরান বিক্ষোভে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৫৪ জন। এর মধ্যে সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের জাহেদান শহরে সবচেয়ে বেশি ৬৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
ওদিকে, সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের চাবাহার শহরের পুলিশ প্রধানের হাতে এক কিশোরীর ধর্ষণের প্রতিবাদ জানাতে জাহেদানে ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর শুরু হয় বিক্ষোভ। এতে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে বহু মানুষ হতাহত হন। বেলুচ অ্যাক্টিভিস্ট ক্যাম্পেইন সেদিন নিহত ৪১ জনের নাম প্রকাশ করে। তবে পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৩ জনে পৌঁছায় বলে জানিয়েছে আইএইচআর।
জাহেদানে বিক্ষোভের সময় সিস্তান-বেলুচিস্তানে ইসলামী বিপ্লবি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা প্রধান আলী মুসাভিও গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
অসলোভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আইএইচআর বলছে, ইরানের ১৭টি প্রদেশে এখন পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী রয়েছে অন্তত ৯ জন।
চলমান বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ‘ইসরায়েলের সেনা’ হিসেবে অভিহিত করছে সরকার ও হিজাবপন্থিরা। তারাও বিক্ষোভ শুরু করেছে এবং সেই বিক্ষোভ সরাসরি সম্প্রচার করা হয় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে।
কুর্দি নারী মাহসা আমিনিকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরানের ‘নৈতিকতা পুলিশ’ গ্রেপ্তার করে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে তেহরানে ঘুরতে আসা মাহসাকে একটি মেট্রো স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি সঠিকভাবে হিজাব করেননি।
পুলিশ হেফাজতে থাকার সময়েই মাহসা অসুস্থ হয়ে পড়েন, এরপর তিনি কোমায় চলে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৬ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। পুলিশ মাহসাকে হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরিবারের অভিযোগ গ্রেপ্তারের পর তাকে পেটানো হয়।
মাহসার মৃত্যুর পর রাস্তায় বিক্ষোভের পাশাপাশি ফেসবুক ও টুইটারে #mahsaamini এবং #Mahsa_Amini হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে চলছে প্রতিবাদ।
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পরই নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। দেশটির ধর্মীয় শাসকদের কাছে নারীদের জন্য এটি ‘অতিক্রম-অযোগ্য সীমারেখা’। বাধ্যতামূলক এই পোশাকবিধি মুসলিম নারীসহ ইরানের সব জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের নারীদের জন্য প্রযোজ্য।
হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য চলতি বছরের ৫ জুলাই ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি একটি আদেশ জারি করেন। এর মাধ্যমে ‘সঠিক নিয়মে’ পোশাকবিধি অনুসরণ না করা নারীদের সরকারি সব অফিস, ব্যাংক এবং গণপরিবহনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত জুলাইয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #no2hijab হ্যাশট্যাগ দিয়ে শুরু হয় প্রতিবাদ। দেশটির নারী অধিকারকর্মীরা ১২ জুলাই সরকারঘোষিত জাতীয় হিজাব ও সতীত্ব দিবসে প্রকাশ্যে তাদের বোরকা ও হিজাব সরানোর ভিডিও পোস্ট করেন।
