সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেআইনি পদ্ধতিতে ব্যবহার করে আসছে আ.লীগ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০১:৫৭ পিএম

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় দেড় দশক সময়কাল ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে অত্যন্ত বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতিতে ব্যবহার করে আসছে। 

আজ শুক্রবার (৭ অক্টোবর) সকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল এ অভিযোগ করেন। 

তিনি বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বেতারবার্তা ভাইরাল হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চ হেডকোয়ার্টার্সের বরাত দিয়ে রাঙামাটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি-ডিএসবি) গত ২৫ সেপ্টেম্বর বেতারবার্তা নম্বর ৩৯০৯ (রাজনৈতিক) মূলে জেলার সকল থানার ওসিদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের রাঙামাটি জেলার কমপক্ষে ৮ জন শীর্ষ ব্যক্তি, প্রতি উপজেলার শীর্ষ ৫ ব্যক্তি এবং রাঙামাটি জেলার সকল পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের অধীন কমপক্ষে ৫ ব্যক্তি যারা বর্তমান সরকার বিরোধী চলমান গণ-আন্দোলনে “জনবল সংগঠক” বা অর্থায়ন করে কিংবা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করে এমন ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য যেমন ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও এনআইডি নম্বর ইত্যাদি সংগ্রহ করে তার কাছে প্রথমে ইমেইল যোগে এবং পরে হার্ড কপি পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে। এই বার্তায় ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চের মেমো নম্বর ৬১৪(৩৫) তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ এর রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশের বিশেষ শাখার নির্দেশনা অনুযায়ীই এই বেতারবার্তা পাঠানো হয়েছে। 

তিনি বলেন, বিএনপি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছে যে ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চের নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশের সকল জেলার পুলিশ সুপার নিজ নিজ এলাকার সকল থানার ওসিকে উপরিউক্ত বেতারবার্তা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহের জন্য অনুরূপ নির্দেশনা জারি করেছেন যা অত্যন্ত ভয়ংকর, অপ্রত্যাশিত, অসাংবিধানিক, এখতিয়ার বহির্ভূত, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আচরণবিধি পরিপন্থী এবং রাজনৈতিক দল তথা গণমানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্দোলন সমাবেশ করার মৌলিক অধিকার বিরোধী। 

মির্জা ফখরুল বলেন, উল্লিখিত বেতারবার্তার বিষয়বস্তু থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমুহহ বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে একটি নীল নকশার অধীনে চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দমন করার জন্য একযোগে কাজ করছে। অথচ বর্তমান গণ-আন্দোলন চলছে মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে এবং এরই মধ্যে গত জুলাই থেকে আমাদের দলের ৫ জন নেতা নিহত হয়েছে (ভোলায় ২ জন, নারায়ণগঞ্জে ১ জন, মুন্সিগঞ্জে ১ জন এবং খুলনায় ১ জন)  এবং অসংখ্য নেতা কর্মী আহত হয়েছে। দিনে দিনে আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, পুলিশ বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতা কর্মীদের যে তথ্য সংগ্রহ করছে তা আমাদের সংবিধান, কিংবা দেশের অন্য কোন প্রচলিত আইন বা বিধিবিধানের আওতায় তারা করতে পারে না। পুলিশ সুপার তার আওতাধীন ওসিদের নিকট বেতারবার্তা বা অন্য কোন ব্যবস্থায় যে সব তথ্য চেয়েছে তা যে কোন মানদণ্ডে বেআইনি, স্বেচ্ছাচারী এবং অননুমোদিত পদক্ষেপ। এটি দিবালোকের মত স্পষ্ট যে বর্তমান সরকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করার জন্য রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, অত্যাচার-নির্যাতনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক মেরুদণ্ডও ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গণ-আন্দোলন দমনের হীন উদ্দেশ্যেই মানুষ হত্যার জন্য শান্তিপূর্ণ আইনসিদ্ধ গণতান্ত্রিক মিছিলে বিনাউস্কানিতে গুলিবর্ষণ করে নেতা কর্মীদের হত্যা করছে। 

'আমাদের দেশের সংবিধান (অনুচ্ছেদ ২৭, ৩২, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪১, ৪৪), প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনেও দেশের প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করা এবং মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকৃত রয়েছে। অসৎ রাজনৈতিক উদেশ্য নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ধরনের বেতারবার্তা বা অন্য প্রকারে তথ্য সংগ্রহ আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর, বেআইনি এবং অসাংবিধানিক।'

তিনি আরো বলেন, এই সরকার প্রায় দেড় দশক সময়কাল ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে অত্যন্ত বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতিতে ব্যবহার করে আসছে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। তারা একটি নীল নকশার অধীনে সামগ্রিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। কেবল অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা পুলিশ ও র‌্যাবকে ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ অনেক মানুষ খুন ও গুম করেছে। যার ফলশ্রুতিতে এখন দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বিশেষ করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা (এসবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) দেশের নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত। 

'ইতিমধ্যে র‌্যাবের ডিজি, আইজিপি এবং সাবেক সেনাপ্রধানকে বলপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত থাকার জন্য মার্কিন সরকার কর্তৃক  নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। বিএনপি মনে করে যে এই সমস্ত নৃশংসতার পিছনে বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসকই মাস্টার মাইন্ড হিসেবে কাজ করছে। এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্দেশ্যমূলক ভাবে উল্টো বিরোধী নেতাকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টিতে লিপ্ত হয়েছে। এই সমস্ত কাজ শুধু আইনি অধিকারই লঙ্ঘন করে না, নাগরিকদের মৌলিক অধিকারও লঙ্ঘন করেছে।'

বিএনপি মহাসচিব বলেন, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণ বা কোন বিশেষ রাজনৈতিক দল করা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার যা দেশের সংবিধান কর্তৃক সমর্থিত। নিজ নিজ মতাদর্শের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন, ইহার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন প্রকারে দলের পক্ষে কাজ করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাগরিকের এই মৌলিক অধিকার চর্চায় বাধা প্রদান কিংবা অন্য কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে যারা অংশগ্রহণ করে বা অন্যান্যভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে তারা আইনানুগভাবেই তা করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নাম ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এমনকি এনআইডি নম্বর আনুষ্ঠানিক অর্থাৎ অফিশিয়ালভাবে সংগ্রহ করার উদ্দেশ্য কি? এটা অস্বাভাবিক। 

তিনি আরও বলেন, পুলিশ একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনী, কোন দলীয় বাহিনী নয়। সরকারিভাবে এসব তথ্য পুলিশের সংগ্রহ করার কথা নয়। এসব তথ্য নিয়ে পরবর্তীতে এ সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে হামলা-মামলা দায়ের কিংবা অন্য কোনোভাবে হয়রানি করাই এদের উদ্দেশ্য বলে আমরা মনে করি।

'বিএনপি পুলিশের বিশেষ শাখার এবং রাঙামাটিসহ সকল জেলার পুলিশ সুপার প্রদত্ত এই ধরনের বেতারবার্তাকে অবৈধ, স্বেচ্ছাচারী এখতিয়ারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত বলে মনে করে। বিএনপি এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে নিজদের এই ধরনের আইন ও এখতিয়ারবহির্ভূত স্বেচ্ছাচারী কাজ থেকে নিজদের বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।'

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত