বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়ায় তীব্র মন্দার কবলে পড়েছে চীনের অর্থনীতি। কারণ বিশ্বজুড়ে চীনা পণ্য বেচাকেনা কমে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে চীনের অর্থনীতি সংকোচন এড়াতে পারেনি। তবে, চীনের অর্থনীতিতে এত বড় ধস নেমে আসাটা প্রত্যাশিত ছিল না।
বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০২২ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৮% হবে বলে আভাস দিয়েছে। অথচ বেইজিং বলেছিল তাদের এবছর ৫.৫% প্রবৃদ্ধি হবে। তদুপরি, গত তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো, চীনের প্রবৃদ্ধি বাকি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চেয়ে পিছিয়ে থাকবে।
ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশনের ২৪ দেশের প্রবৃদ্ধির আভাসে ২০২২ সালে এশিয়া প্যাসিফিকের প্রবৃদ্ধির হার ৫% থেকে কমিয়ে ৩.২% নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ, চীনকে বাদ দিয়ে অঞ্চলটিতে ৫.৩% হারে প্রবৃদ্ধি হবে।
ফোর্বস এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট চীন দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। লন্ডন-ভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, এই বছর এখন পর্যন্ত চাপের মধ্যে থাকা চীনের অর্থনীতি আরও খারাপ হতে চলেছে’।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নীল শিয়ারিং বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর ধরেই সতর্ক করে আসছি যে, কেন আমরা চীনের সম্ভাব্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে চলমান ঐকমত্যকে ভুল বলে মনে করছি এবং দেখিয়েছি যে, কীভাবে এই দশকের শেষ নাগাদ চীনা অর্থনীতি মাত্র ২% হারে বৃদ্ধি পাবে।’
তার মতে, চীন একটি ‘প্রজন্মগত’ বা কাঠামোগত মন্দার সম্মুখীন হচ্ছে। তবে চীনের অর্থনীতিতে মন্দার ফলে ‘বিশ্ব অর্থনীতিও ডুবে যাবে’ এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তার মতে, যেভাবে চীনকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ‘মূল চালক’ হিসেবে দেখানো তা হয় অতিরঞ্জিত এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
কাঠামোগত মন্দা
মজার বিষয় হল, ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স কোভিড মহামারীর অন্তত দুই বছর আগেই চীনা অর্থনীতিতে একটি বড় মন্দার পূর্বাভাস দিয়েছিল। মহামারীর ফলে সেই প্রবণতা তীব্র হয়েছে।
এই সংগঠনের প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ মার্কস উইলিয়ামস ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, ‘চীনের প্রবৃদ্ধি এবং পণ্যের চাহিদার একটি মূল চালিকা শক্তি নির্মাণ খাত আগামী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে আসবে। এমনকি অর্থনীতি বর্তমান সংকট থেকে রক্ষা পেলেও’।
২০২১ সালের মাঝামাঝি চীনে এভারগ্রান্ডে সঙ্কট প্রকাশের পর এক নোটে একথা বলেন তিনি। তার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দীর্ঘস্থায়ী পতনের পর সম্পত্তি সংকট দেখা দেবে’।
সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেট এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি সহজ। রিয়েল এস্টেট কর্মশক্তির ১০%, মোট স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগের ২৫% এবং জিডিপির ২৯%। সুতরাং, রিয়েল এস্টেট খাতে মন্দা দেখা দিলে বাকি সবকিছুতেই মন্দা দেখা দেবে।
দ্য গার্ডিয়ানের মতে, ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত, ‘চীনের ৭০টি শহরে নতুন বাড়ির দাম বছরে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি তথা ১.৩% হারে কমেছে (সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে) এবং সমস্ত সম্পত্তি ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশকে খারাপ ঋণ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে‘।
এদিকে, ২০২২ সালের প্রথম আট মাসে চীনের ইস্পাত উৎপাদন ৫.৭% কমেছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশ। স্পষ্টতই, ক্রমহ্রাসমান বৈশ্বিক চাহিদাও চীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আগস্টের মাসিক তথ্য-উপাত্তে চীনের ভেতরে খুচরা বিক্রয়েও পতন দেখা গেছে এবং ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স সেপ্টেম্বরে আরও পতনের পূর্বাভাস দিয়েছে। কমে যাওয়া ভোক্তা চাহিদা (রপ্তানি এবং দেশীয় পণ্য উভয়ই) কর্পোরেট মুনাফার উপর প্রভাব ফেলছে।
২৭ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের (এনবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই মাসে ১.১% পতনের পর ২০২২ সালের প্রথম আট মাসে শিল্প খাতের মুনাফা ২.১% কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ তীব্র মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধিতে ভোগায় সামনের দিনগুলো চীনের জন্য আরও কঠিন হতে পারে।
নিল শিয়ারিং অনুমান করেছেন যে, ২০২২ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি একেবারে শুন্যের কোঠায়ও গিয়ে ঠেকতে পারে।
বেকায়দায় চীন
তাহলে এখন প্রশ্ন হতে পারে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে চীন সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেন?
তারা আসলেই চেষ্টা করছে। ব্লুমবার্গের মতে, চীন নির্মাণখাতে অতিরিক্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ব্লুমবার্গ (আগস্ট ১৭) অনুসারে, স্যাটেলাইটে তোলা ছবিগুলো দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, জুলাই মাসে চীনে রাস্তা নির্মাণের কাজ বেড়েছে।
কিন্তু এই পদক্ষেপ যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারছে না। কারণ সম্পত্তি খাতে নাটকীয় মন্দার ক্ষতিপূরণের জন্য ব্যয় যথেষ্ট নয়। এবং, চীন সম্পত্তি খাতে বেশি ব্যয় করতে বা বেল আউট করতে পারবে না। কারণ তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য মুদ্রা হিসেবে ডলারের একটি অনন্য সুবিধা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হার বৃদ্ধি অন্যান্য সমস্ত মুদ্রার বিপরীতে ডলারকে অযাচিত ভাবে শক্তিশালী করেছে। মার্কিন ডলার সূচক, যা এটির আন্তর্জাতিক মূল্যের মানদণ্ড, বছরে ১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলস্বরূপ, চীনা মুদ্রা ইতিমধ্যে গত বছরের তুলনায় ১১ শতাংশের বেশি অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে। আর চীন তাদের মুদ্রার বাজার দর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। যার অর্থ চীনা মুদ্রার প্রকৃত মূল্য অজানা।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের মতে, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রার নাটকীয় অবমূল্যায়ন রোধে লড়াই করছে। ‘মুদ্রার সামান্যতম দুর্বলতা প্রকাশ হলে দেশে থেকে মূলধন বের হয়ে যেতে থাকবে,’ যার ফলে অভ্যন্তরীণ আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।
বলা বাহুল্য যে, সম্পত্তি সংকটের পর এ ধরনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সংক্ষেপে বলা যায়, চীনের অর্থনীতি এক কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে। যেখান থেকে তাদের বের হয়ে আসতে লম্বা সময় লেগে যাবে।
